জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যায় অভিযুক্ত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে একাধিক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও ভারতে পলতাক বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা ভূমিকাসহ একটি বই বিক্রি করছে রকমারি ডটকম, বাতিঘর সহ বেশ কিছু অনলাইন বই বিক্রির প্লাটফর্ম। "The Yunus Files: Unmasking a Fake Saint" নামের বইটি লিখেছেন নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং পলাতক এনএসআই কর্মকর্তা আমিনুল হক পলাশ। ৫ আগস্টের আগে এনএসআই-তে কর্মরত থাকলেও অভ্যুত্থানের পর তিনি পালিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং তার বিরুদ্ধে সরকারি নথি গায়েবের অভিযোগে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
আমিনুল হক পলাশের সাথে বইটির সহলেখক হলেন প্রবীর বিধান, যিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা ঢাকা ট্রিবিউনে এক সময় কর্মরত ছিলেন। তার পুরো নাম প্রবীর কুমার সরকার। প্রবীর কুমার সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রোপাগান্ডা কন্টেন্ট প্রচার করেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন তারেক রহমানকে নিয়ে তার লেখা একটি বইয়ের নাম “The Dark Prince”।
এছাড়াও ঢাকা ট্রিবিউনের একাধিক কলামে তারেক রহমান, হাওয়া ভবন, দুর্নীতির অভিযোগ, সন্ত্রাসে পৃষ্ঠপোষকতা এবং ২০০১-০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারের শাসনামল নিয়ে সমালোচনা করেছেন তিনি।
অনলাইন বুকশপ রকমারি এবং বাতিঘর বইটি বিক্রি করছে। আর্কাইভ দেখুন এখানে ও এখানে। আজ রোববার সন্ধ্যায় বাতিঘরের ফেসবুক পেইজে বইটি বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে পোস্ট করা হয়। যদিও এর প্রতিবাদে অনেকে পোস্ট করলে বাতিঘর বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেয়। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রকমারি ডটকম এবং বাতিঘরের ওয়েবসাইটে বইটির বিজ্ঞাপনের লিংক সচল দেখা গেছে।

বইটি প্রকাশ করেছে নালন্দা প্রকাশনী। নালন্দার ফেসবুক পেইজেও এটির বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে গত ২৫ তারিখ।
বইটিতে পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার লেখা একটি দীর্ঘ ভূমিকা রয়েছে। পলাতক পলাশ নিয়মিত অনলাইনে আওয়ামী লীগের হয়ে ভুয়া খবর ও প্রোপাগান্ডা কন্টেন্ট প্রচার করেন। তার বইটিতেও মূলত জুলাই অভ্যুত্থান এবং সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেয় করে বিভিন্ন ধরনের লেখা রয়েছে।
একজন পলাতক সরকারি কর্মকর্তা– যার বিরুদ্ধে সরকারি নথি চুরি এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ও দলের পক্ষে প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইনের অভিযোগ রয়েছে– এমন ব্যক্তির বই প্রকাশ ও বিক্রি নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা চলছে।
ষুশ্মিট আষিফ নামে একজন লিখেছেন, “আসলেই বাতিঘর বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থায় বিদেশি রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করা পলাতক (অগাস্টের পরে পালায়ে বিলেত গেছিলো আরেক বড় গোয়েন্দার সাথে মিলিত হতে) অপারেটিভ আমিনুল পলাশের (যে কি না আওয়ামি প্রোপাগান্ডা মেশিনের কি-মেম্বার, হাসিনার পেয়ারের ঘেঁটু) প্রোপাগান্ডাকে প্রোমোট করতেছে? চলেন বাতিঘরে চা খাইতে যাই একটু। অনেক দিন বাতিঘর যাই না। বয়সকালে এখানে নিজের মাসের টুইশনের বেতনের অর্ধেক উড়াতাম।”
তাহমিদুল ইসলাম নামে আরেকজন লিখেছেন, “দীপংকর দাসের বাতিঘর এই বইটা প্রমোট করছে দেখলাম। সাজয়ে বিক্রি করছে। বইটা লিখেছে একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, যে আওয়ামীলীগের আমলে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থেকে পলাতক আমিনুল হক পলাশ। একজন পলাতক, মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তির প্রোপাগাণ্ডাকে বই হিসেবে ছাপানোর সাহস করলো কে? বাতিঘর এই বইয়ের বিজ্ঞাপন কীভাবে দেয়?
বাতিঘরের পেছনে ব্যাকআপ দিচ্ছে কে? ভারত? আমরা জানি ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়েছিল আওয়ামীলীগ এবং ভারত। ভারত লুঙ্গী ধুতি গোচ দিয়ে নেমেছিল বাংলাদেশকে ব্যর্থ করতে। একই প্রোপাগাণ্ডা বই হিসেবে ছেপেছে। এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছে শেখ হাসিনা। এই বই প্রকাশ এবং বিক্রি হয় কী করে? সরকারের উচিৎ এই ব্যাপারটাকে সহজভাবে না নেয়া।”
এই বিষয়ে বাতিঘর প্রকাশনীর কর্ণধার দীপঙ্কর দাশের কাছে বইটি বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রথমে তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। পরে একাধিক ব্যক্তির ফোন পাওয়ার পর বিষয়টি তাদের নজরে আসে।
তিনি বলেন, "আমরা তো সব বই বিক্রি করি। প্রকাশক বই পাঠালে আমরা বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করি। আমরা এটা এখন স্টপ করলাম। আমরা তো জানতাম না উনি (লেখক পলাশ) গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন।"
দীপঙ্কর দাবি করেন, বইটিতে শেখ হাসিনার লেখা ভূমিকা রয়েছে তা তিনি জানতেন না।
"বই তো এখানে শত শত আসে। কে ভূমিকা লিখেছে, সেটা আমাদের জানা ছিল না। লাখ লাখ বই এখানে। প্রত্যেকটা বই আমরা আলাদাভাবে বিচার করে বিক্রি করতে পারি না", বলেন তিনি।
নালন্দার ফেসবুক পেইজে পাওয়া নাম্বারে কল দিলে একজন রিসিভ করে বলেন, “নালন্দার প্রকাশক বিদেশে থাকেন। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে জাহিদুল ইসলাম তুহিন নামে একজন চালান৷ জাহিদুল ইসলাম তুহিন ওই নাম্বারটি ব্যবহার করলেও তিনি ওই মুহূর্তে ফোনের কাছে নেই বলে জানানো হয়।”
রকমারির ওয়েবসাইট থেকে নম্বর নিয়ে একাধিকবার কল করলেও কেউ রিসিভ করেননি।