জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম বাড়িয়ে তা তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৪ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা) আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব মতামত দেন অর্থনীতিবিদ ও তামাকবিরোধী নেতারা।
এসময় তারা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তর কমানো, সুনির্দিষ্ট শুল্ক প্রবর্তন এবং সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম কার্যকরভাবে বৃদ্ধি করা হলে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ—উভয়ই সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে (সাময়িক হিসাব অনুযায়ী) দেশের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত।
অথচ সিগারেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশ দখলে থাকা নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বা শলাকাপ্রতি ২০ পয়সা। মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের দাম যথাক্রমে ১৫ শতাংশ, ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, করহার অপরিবর্তিত রেখে শুধু দাম বাড়ানোর ফলে বর্ধিত মূল্যের একটি অংশ তামাক কোম্পানির মুনাফা হিসেবে চলে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, প্রিমিয়াম স্তরের প্রতি প্যাকেট সিগারেটের দাম ২৫ টাকা বাড়ানো হলেও এর মধ্যে ৪ টাকা ২৫ পয়সা কোম্পানির কাছে থেকে যাবে। কর বৃদ্ধির মাধ্যমে একই পরিমাণ দাম বাড়ানো হলে পুরো অর্থই সরকারি কোষাগারে জমা হতো।
তারা আরও বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম এবং করহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোর ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে নতুন ধরনের তামাকপণ্যকে কার্যত আইনগত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বক্তাদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেট পাস হলে মাথাপিছু আয় ও নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় তামাকপণ্য আরও সহজলভ্য ও সস্তা হয়ে পড়বে। এতে সিগারেটসহ সব ধরনের তামাকপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে, সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে এবং তামাক কোম্পানিগুলো লাভবান হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং বিদ্যমান শুল্কের পাশাপাশি সব স্তরে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ করা হলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম বাড়িয়ে তা তরুণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ২০ শলাকার ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিড়ির অভিন্ন মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রে যথাক্রমে প্রতি ১০ গ্রামে ৬০ টাকা ও ৩০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং সব তামাকপণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার দাবি জানানো হয়।
বক্তারা জানান, তামাকবিরোধীদের প্রস্তাবিত কর ও মূল্য প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ধূমপান কমার পাশাপাশি সরকারের অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৪ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে।