হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত রিং বা স্টেন্টের ওপর থেকে প্রস্তাবিত বাজেটে (২০২৬-২০২৭ অর্থবছর) ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হলেও, জীবন রক্ষাকারী এই চিকিৎসার মূল সংকটটি এখনো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। হৃদরোগীদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, ভালভ এবং শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ নিরাময়ের ডিভাইসের আকাশচুম্বী দাম ও শুল্ক কমানোর বিষয়ে বাজেটে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ফলে এই বাজেট জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের লাখ লাখ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কোনো আশার আলো দেখাতে পারছে না। প্রস্তাবিত বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এসব জীবনরক্ষাকারী সামগ্রীর ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী হার্টের রিং ও কিডনি ডায়ালাইজারের ওপর থেকে বিদ্যমান ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন। তবে দেশে চারটি ক্যাটাগরিতে মোট ১২ ধরনের হার্টের ডিভাইস আমদানি করা হয়, যেগুলোর শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে বাজেটে কোনো কথা বলা হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, ভালভ এবং শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের বিভিন্ন ক্লোজার ডিভাইস। অতিউচ্চ মূল্যের কারণে হৃদরোগের চিকিৎসা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে অর্থাভাবে মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ হওয়ায় দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
পরিসংখ্যানে হৃদরোগের ভয়াবহতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর ৯ লাখ ৯২ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে দুই লাখেরও বেশি মানুষ।
অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর মোট মৃত্যুর একটি বড় অংশই ঘটে হৃদরোগ ও রক্তনালিসংক্রান্ত (কার্ডিওভাসকুলার) জটিলতার কারণে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৭৭৭ জন মানুষ হৃদরোগে প্রাণ হারাচ্ছেন।
উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও। বর্তমানে প্রায় চার লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের হৃদরোগে ভুগছে। প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার শিশু হৃদরোগ নিয়ে জন্মায় এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে আক্রান্ত এসব শিশুর প্রায় ৪০ শতাংশই মারা যায়।
চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং ঢাকার কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, হৃদরোগ চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত ‘সিঙ্গেল চেম্বার’ পেসমেকার বসাতে সরকারি হাসপাতালে ২৫ হাজার টাকা খরচ হলেও, বেসরকারি হাসপাতালে শুধু পেসমেকার কিনতেই খরচ হয় ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আর ‘ডাবল চেম্বার’ পেসমেকার কিনতে হাসপাতালভেদে খরচ হয় ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে প্রতিস্থাপন বা অপারেশন খরচ আরও ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার টাকা যুক্ত হয়ে বেসরকারি খাতে এই ব্যয় দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
ওপেন হার্ট সার্জারির জন্য জরুরি অক্সিজেনেটরের মূল্য সরকারিভাবে প্রতিস্থাপন খরচসহ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা হলেও বেসরকারি হাসপাতালে তা ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাঁড়ায়। শিশুদের জন্মগত হার্টের ছিদ্র বন্ধ করার ‘এএসডি’ ও ‘ভিএসডি’ ডিভাইসের খরচ সরকারি হাসপাতালে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
হাসপাতালের করিডোরে দীর্ঘ অপেক্ষা
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থেকে আসা দিনমজুর মনির হোসেন তার ৯ বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে অপারেশনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তার মেয়ে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত। বেসরকারি হাসপাতালে আড়াই লাখ টাকার বেশি খরচ চাওয়ায় বাধ্য হয়ে লম্বা সিরিয়াল মেনে সরকারি হাসপাতালেই ভর্তি আছেন। কিন্তু এখানকার আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
মনির হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মেয়ের হার্টে ছিদ্র ধরা পড়েছে, অপারেশন করে ডিভাইস বসাতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে করানোর সামর্থ্য আমার নেই, তাই সরকারি হাসপাতালেই অপেক্ষা করছি।’
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা সত্তরোর্ধ্ব হাদি রহমানও একই হাসপাতালে পেসমেকার বসানোর অপেক্ষায় আছেন। হৃদরোগের চিকিৎসায় তার পরিবার ইতোমধ্যে সর্বস্বান্ত। পেসমেকারের খরচ জোগানো এবং সামনের দিনগুলোতে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে গভীর সংকটে আছেন তিনি। স্বজন হিসেবে সঙ্গে থাকা মেয়ে লুবনা বলেন, ‘অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে চিকিৎসার প্রতিটি সামগ্রীর এই আকাশচুম্বী দাম আমাদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
মেডিকেল ডিভাইস আমদানিকারক মাহবুবুর রহমান ডালিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে হার্টের রিংয়ের শুল্ক যেভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে, ঠিক তেমনি পেসমেকারসহ অন্যান্য জীবন রক্ষাকারী ডিভাইসের শুল্ক তুলে নেওয়া হলে এগুলোর দাম অনেকটাই কমে যেত। এতে হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো।’
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তৌফিকুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অতি উচ্চমূল্যের কারণে সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে অনেক রোগী মারা যান। সরকারের দেওয়া সীমিত ডিভাইস দিয়ে আমরা অনেক অপারেশন করলেও, সুবিধার বাইরে থেকে যায় বিশাল এক জনগোষ্ঠী। হার্টের স্টেন্টের পাশাপাশি অন্যান্য জরুরি ডিভাইসের শুল্ক প্রত্যাহার করা এখন সময়ের দাবি।’
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাজেটে হার্টের স্টেন্ট বা রিংয়ের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি একটি চমৎকার উদ্যোগ। তবে সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ থাকবে, জন্মগত হৃদরোগের ছিদ্র বন্ধ করার ডিভাইস, পেসমেকার এবং অক্সিজেনেটরের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীগুলোর ওপর থেকেও যেন শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়। এটি করা গেলে দেশের প্রান্তিক ও গরিব মানুষের জীবন রক্ষা করা অনেক সহজ হবে।’