Image description

২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার পরিবার এবং সেবাগ্রহীতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এক জরিপের ফলাফলে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত ‘খানা জরিপ ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যেখানে দুর্নীতির শিকার পরিবারের হার ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশে। একই সময়ে ঘুষের শিকার পরিবারের হার ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ১৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং ঘুষের শিকার হওয়ার হার ২৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।

টি আই বি এর জরিপে দেখা গেছে, জাতীয়ভাবে সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছেন এবং ৩৩ দশমিক ২ শতাংশকে ঘুষ দিতে হয়েছে। নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ সমস্যার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ সহায়তা ও বীমা খাতে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ভূমি, কৃষি ও পাসপোর্ট খাতে পুরুষদের মধ্যে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা বেশি পাওয়া গেছে।

বর্তমান জরিপের ফলাফল বলছে,২০২৩ সালের তুলনায় পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৯ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়ার কারণে জাতীয় পর্যায়ে মোট ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশে মোট প্রাক্কলিত ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এই অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০ দশমিক ২৩ শতাংশের সমান।

দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের মতো ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট ও বিআরটিএ খাত সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, পাসপোর্ট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার পরও এ খাতে ঘুষ লেনদেনের প্রবণতা উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে।

এদিকে বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যাংকিং ও ভূমি খাতে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় দুর্নীতির উচ্চ হার সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কৃষি, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পাসপোর্ট ও বিআরটিএর মতো খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের উচ্চ হার মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। নাগরিকদের স্বাভাবিক সেবাপ্রাপ্তির অধিকার ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ সহায়তা এবং বীমা খাতে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। সেবা গ্রহণের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদেরকে তুলনামূলক বেশি অনিয়ম ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে। অন্যদিকে পাসপোর্ট, ভূমি ও কৃষি খাতে পুরুষদের মধ্যে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার বেশি দেখা গেছে। সেবার ধরন ও ব্যবহারকারীদের দুর্নীতির অভিজ্ঞতা খাতভেদে এ ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে ।

টি আই বি ইঙ্গিত করছে, দুর্নীতি দমনে বিভিন্ন উদ্যোগ ও সংস্কারের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বরং নাগরিকদের অভিজ্ঞতায় সেবাখাতে দুর্নীতির বিস্তার আরও গভীর হয়েছে।