Image description

দেশের সরকারি সেবাখাতে দুর্নীতি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ঘুষ ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে পাসপোর্ট অফিস এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সবশেষ খানা জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে 'সেবাখাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫' শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

জরিপ অনুযায়ী, সেবাখাতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত পাসপোর্ট অফিস। পাসপোর্ট পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া পরিবারের হার জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭৬.৬ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে এই হার আরও বেশি, ৭৯.১ শতাংশ। আর শহরে ৭১.৮ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিআরটিএতে ঘুষের হার ৬৩.৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও কৃষি খাত— উভয়ক্ষেত্রে ৪৯.৩ শতাংশ পরিবারের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করা হয়। আর ভূমি সেবায় ঘুষের হার ৪৭.৬ শতাংশ।

সার্বিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেবাখাতে মানুষকে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার বেশি নিয়মবহির্ভূত অর্থ বা ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। দেশের ৬৩.৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি খাতে ঘুষের শিকার হয়েছে। আর ৮১.৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির মুখোমুখি হয়েছেন, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০.৯ শতাংশ। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৭.২ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, ঘুষ না দিলে তারা সেবাই পান না।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, এই দুর্নীতির বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করছেন সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ। আয়ের অনুপাতে হিসাব করলে নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর ঘুষের আর্থিক চাপ ধনীদের তুলনায় অনেক বেশি। নারীদের সেবাপ্রাপ্তিতেও বৈষম্য ও অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট।

পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে করণীয় সম্পর্কে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের ৩১ দফাভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার রূপরেখা, নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সেবাখাতের জন্য একটি সমন্বিত কৌশল ও পথরেখা প্রণয়ন করতে হবে। বাস্তবায়নযোগ্য সব কর্মপরিকল্পনায় সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী উপাদান বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না।

সরকারি সেবার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ যত কমানো যাবে, অনিয়ম ও ঘুষের সুযোগও তত কমবে। এ জন্য সরকারি সেবাগুলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার পাশাপাশি নাগরিকদের অনলাইন সেবায় উৎসাহিত করতে ব্যাপক প্রচারণা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।

পাসপোর্ট ও বিআরটিএর মতো সেবা অনলাইনে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও কেন দুর্নীতি কমছে না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দালাল চক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশ বন্ধ না হওয়ায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই দালালের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

রাজস্ব খাতের দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়, করদাতার সংখ্যা কম হওয়ায় জরিপে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অবস্থান নিচের দিকে দেখালেও বাস্তবে এখানে দুর্নীতি অত্যন্ত গভীরে শিকড় গেড়ে আছে। আলোচিত 'ছাগল কাণ্ড' ও কর্মকর্তাদের অপ্রদর্শিত সম্পদের ঘটনাগুলো সেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিরই প্রমাণ।

সেবাখাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে টিআইবি ১০ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা, সেবা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াকে দালালমুক্ত করা, দুদকের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা এবং তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।