প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিষয়ে সবকিছু ছাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাজ করা দুই ফটোগ্রাফারকে নিয়ে সমালোচনা। মূলত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের পেজে শেয়ার করা সফরের বিভিন্ন স্থিরচিত্র ও ভিডিও এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাজ করা ফটোগ্রাফারদের ধারণ করা স্থিরচিত্র ও ভিডিওর মানের তুলনা করে এসব সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
আর এসব সমালোচনায় যোগ দিয়েছেন খোদ বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট, এমনকি দলীয় নেতাকর্মীরাও।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তার সঙ্গে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ খালেদ ও ফটোগ্রাফার খালেদ হোসাইন পরাগ।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ফটোগ্রাফাররা যেভাবে চিত্র ধারণ করেছেন, সেগুলোর শৈল্পিক মান এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পেজ থেকে শেয়ার দেওয়া ছবির শৈল্পিক মান ও অ্যাঙ্গেলের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে বলে মনে করেন সমালোচকরা।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পেজ থেকে সফরের বিভিন্ন মুহূর্ত একসঙ্গে এনে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। ভিডিওটিতে বাংলাদেশি শিল্পী হাবিব ওয়াহিদের গাওয়া “আমার বন্ধু মহা জাদু জানে” গানটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওটি বাংলাদেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইতোমধ্যে শিল্পী হাবিব ওয়াহিদ তার গাওয়া গান ব্যবহার করায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ফটোগ্রাফারদের নিয়ে ট্রলের বন্যা
সিনিয়র ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ খালেদ একটি পোস্ট দিয়েছেন, যেখানে কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের খাম এবং খামের ওপর হাইকমিশন থেকে সংগ্রহ করা সিম নম্বরও রয়েছে। এছাড়া খালেদ যে হোটেলে ছিলেন, সে হোটেলের নাম ও রুম নম্বরও দেখা যাচ্ছে পোস্টটিতে। এ ধরনের তথ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করাকে নিরাপত্তা ইস্যু মনে করছেন অনেকেই।

এছাড়াও মোহাম্মদ খালেদ নিজের অনেকগুলো সেলফি পোস্ট করেছেন তার ওয়ালে। এটিকেও সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছেন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা। কাজে মনোযোগ না দিয়ে সেলফি তোলায় ব্যস্ত বলে পোস্টগুলোতে সমালোচনায় মুখর হয়েছেন ব্যবহারকারীরা।
সমালোচনা করে রুমি আহমেদ নামে আমেরিকা প্রবাসী একজন চিকিৎসক লিখেছেন, “এই ছাগলটাকে প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে! এই সফরের যে কয়টি ভালো ছবি এসেছে, সবগুলোই এসেছে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রেস পুল থেকে! আর (?) সিনিয়র ফটোগ্রাফার সাহেব নিজের সেলফি তুলতেই ব্যস্ত! শুধু সেলফিই না, নিজের রুম নম্বর, ফোন সিম নম্বর, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড—সবকিছুর ছবি তুলে পাবলিকলি পোস্ট করছেন! এগুলো সিকিউরিটি রিস্কও তো! ফটোগ্রাফার কে সঙ্গে যাবে, তা তো প্রধানমন্ত্রীর জানার কথা না! এগুলো পিএমওর কাজ, প্রেস উইংয়ের কাজ, ডিএফপির কাজ! কিছু কিছু কাজ আছে, সেখানে স্কিলড কাজ জানা লোক দিতে হয়!”
ফটোগ্রাফার খালেদ হোসাইন পরাগ ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছেন, এমন একটি পোস্ট করেন তার আইডিতে। ছবিটি ধারণ করেছেন অপর ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ খালেদ। পোস্টটির ক্যাপশনে পরাগ লিখেছেন, “Foto: Khaled bhi.” এখানে “Photo” না লিখে “Foto” লেখায় সেটি নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে ট্রল করেছেন অনেকে। বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট আহমেদ অরিত্র ট্রল করে লিখেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর সিনিয়র ফটোগ্রাফারের একটা Foto। Foto তুলেছেন আরেক সিনিয়র ফটোগ্রাফার খালেদ bhi।”

ফাহাম আব্দুস সালাম দুই ফটোগ্রাফারের কাজের সমালোচনা করে লিখেছেন, “আর আমার বন্ধু কোনো জাদুই জানে না।

বিএনপির মিডিয়া টিম ভালো ছিল না—কারণ, কোয়াইট ফ্র্যাঙ্কলি, বিএনপির কাছে পয়সা ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ফটোগ্রাফার ও ভিডিও টিম প্যাথেটিক—এইটা একেবারেই মেনে নেওয়ার মতো না। আপনারা এখানে দয়া করে প্রফেশনালদের নিয়োগ দিন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর টিম যে ভিডিওটা করেছে, বাংলাদেশে অসংখ্য ছেলেমেয়ে এর চেয়ে ভালো কাজ করতে সক্ষম এবং করেও অহরহ। এদেরকে কাজে লাগান। আজকের দিনে ভিডিওগ্রাফার আর ফটোগ্রাফাররাই ক্রনিকলার অব হিস্ট্রি। একজন প্রধানমন্ত্রীর টিম প্রফেশনালদের হাতে ছেড়ে দিন।”
বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ এম রাশেদ লিখেছেন, “সামান্য ফটোগ্রাফার ইস্যুতেই মালয়েশিয়া চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কেন তারা মালয়েশিয়া। আমরা কি কিছু শিখব? প্রফেশনাল হতে তো বেশি পয়সা লাগে না।”

আরিফ আদনান নামের একজন লিখেছেন, “এনি ভাই তার পেজ থেকে মালয়েশিয়ান ভাইরাল ভিডিওটা আপলোড দিছে। মনে হইতাসে তার অধীনে থাকা বিএনপি মিডিয়া সেলের কাজ এইটা। উফফফ, আগুন পুরা। শেয়ার দেয় নাই কিন্তু। ডাউনলোড করে আপলোড দিছে। এবং কোনো ধরনের কার্টেসি দেয় নাই। গতকাল তারেক রহমানের পেজ থেকে কিছু ছবি আপলোড দেওয়া হইছে, যেগুলো মালয়েশিয়ান প্রাইম মিনিস্টারের পেজ থেকে চুরি করে মেরে দিছে। এগেইন, এখানেও কোনো ধরনের মেনশন কিংবা কার্টেসি দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে নাই পেজ পরিচালনাকারী লোকজন। একটা সাধারণ ভদ্রতাও এদের মাথায় আসে না! টপ টু বটম এক পাল অথর্ব কিংবা সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া চালানোর যোগ্যতাও নাই, এমন মানুষ দিয়ে চলছে!”
সমালোচনা গায়ে মাখছেন না দুই ফটোগ্রাফার
ফেসবুকের সমালোচনাকে থোড়াই কেয়ার করছেন দুই ফটোগ্রাফার। সমালোচকদের উদ্দেশে দিয়েছেন ইঙ্গিতমূলক পোস্ট। হাসিমুখে তোলা নিজের একটি সেলফি পোস্ট করে সিনিয়র ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ খালেদ লিখেছেন, “আমার খুব ক্ষতি করে ফেললেন, কেউ আর আমার সঙ্গে সেলফি তুলতে চায় না…” কিছুক্ষণ পর অবশ্য তিনি পোস্টটি ডিলিট করে দেন।

আরেক ফটোগ্রাফার খালেদ হোসাইন পরাগ পোস্ট করেছেন, “থামলেন কেন?” এই পোস্টে ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন মন্তব্য করতে দেখা যায়। বিরূপ মন্তব্যকারীদের পাল্টা কটাক্ষ করে কমেন্ট করতে দেখা যায় তাকে। মোহাম্মদ ইমরান হোসেন নামের একজন মন্তব্য করেছেন, “এর চেয়ে সুন্দর ছবি কক্সবাজারের পিচ্চি পিচ্চি পোলাপান তুলে।” জবাবে পরাগ লিখেছেন, “কথা ঠিক। আসলে রুচির ব্যাপার।” কটাক্ষ করে করা অন্যান্য মন্তব্যেরও পাল্টা জবাব দিয়েছেন পরাগ।