Image description

প্রকৃতির ভাণ্ডারে এমন কিছু পাখি আছে, যাদের দেখা পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। সাইক্সের রাতচরা তেমনই একটি পাখি। বিরল, নিশাচর এবং অসাধারণ ছদ্মবেশী। দিনের আলোয় চোখের সামনে থাকলেও তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের পাখিপ্রেমী ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের কাছেও এটি অত্যন্ত আগ্রহের একটি প্রজাতি।

সম্প্রতি ব্রহ্মপুত্র নদের চরে এই বিরল পাখিটির ছবি তুলেছেন রংপুরের সৌখিন আলোকচিত্রী ও প্রকৌশলী একেএম ফজলুল হক। উড়ন্ত অবস্থায় তোলা ছবিতে ধরা পড়েছে পাখিটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে সাইক্সের রাতচরার দেখা মেলে খুব কম। তাই পাখিটির সাম্প্রতিক উপস্থিতি পাখিপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

সাইক্সের রাতচরার ইংরেজি নাম ‘সাইক্স নাইটজার’। এর আরেকটি ইংরেজি নাম ‘সিন্ধ নাইটজার’। ক্যাপ্রিমুলজিডি গোত্রভুক্ত এই পাখিটির কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই। ইংরেজি নামের অনুবাদ থেকেই ‘সাইক্সের রাতচরা’ নামটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

 

বাংলাদেশে পাখিটি অত্যন্ত বিরল। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমবারের মতো রাজশাহীর পদ্মা নদীর চরে এ প্রজাতির একটি পাখির উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এর আর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি ব্রহ্মপুত্রের চরে এর ছবি তোলা হওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে পাখিটি।

বিশ্বব্যাপী পাখিটির বিস্তৃতি মূলত পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে। বিশেষ করে শুষ্ক, আধা-মরুভূমি অঞ্চল এবং খোলা চরাঞ্চলে এদের বেশি দেখা যায়। প্রকৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকার ক্ষমতা রয়েছে যে কাছাকাছি থাকলেও অনেক সময় তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।

সাইক্সের রাতচরার দেহ ছিপছিপে। দৈর্ঘ্য সাধারণত ২১ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার। অন্যান্য রাতচরা প্রজাতির তুলনায় এর লেজ কিছুটা খাটো। একনজরে পালকের রং ধূসর মনে হলেও এর ওপর ছড়িয়ে থাকে বিভিন্ন আকারের হালকা হলদে ও কালচে ছোপ। শরীরের মেটে ও হালকা খয়েরি রঙের মিশ্রণ পাখিটিকে পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করে। ডানা ও লেজের কিছু অংশে স্পষ্ট সাদা পালক থাকে, যা উড়ন্ত অবস্থায় সহজে চোখে পড়ে।

 

গলার দুই পাশে রয়েছে সাদা ছোপ। পুরুষ পাখির ডানা ও লেজের প্রান্তে গোলাকার সাদা দাগ দেখা যায়। স্ত্রী পাখির ক্ষেত্রে সেই অংশ কিছুটা হলদে রঙের হয়। ঘাড়ে কোনো দাগ থাকে না। চঞ্চু বাদামি, যার আগা কালো। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল ফ্যাকাশে বর্ণের।

নিশাচর স্বভাবের কারণে দিনের বেশিরভাগ সময় এরা মাটিতে ঝরা পাতার ওপর কিংবা বালুচরে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে। অনেক সময় গাছের ডালেও অবস্থান করতে দেখা যায়। শরীরের রং ও নকশা আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে এতটাই মিশে যায় যে চোখের সামনে থাকলেও শনাক্ত করা কঠিন। এ কারণেই সাইক্সের রাতচরাকে প্রকৃতির অন্যতম দক্ষ ছদ্মবেশী পাখি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

খাদ্যতালিকায় রয়েছে উড়ন্ত পোকামাকড়, মথ এবং বিভিন্ন ধরনের গুবরে পোকা। সন্ধ্যা নামার পর কিংবা গভীর রাতে এরা খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। দ্রুত উড়ে বেড়ানোর সময় নরম সুরে ‘চূক-চূক-চূক’ শব্দে ডাকতে শোনা যায়।

মার্চ থেকে মে মাস এদের প্রজননকাল। এ সময় পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের শুষ্ক ও আধা-মরুভূমি অঞ্চলের উন্মুক্ত মাঠে ডিম পাড়ে। সাধারণত দুটি ডিম দেয়। ডিমের রং ধূসরাভ, যার ওপর কালচে ছিটছোপ থাকে। একটি সাইক্সের রাতচরার গড় আয়ুষ্কাল পাঁচ থেকে ছয় বছর।

আলোকচিত্রী একেএম ফজলুল হক জানান, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাইক্সের রাতচরা অত্যন্ত বিরল একটি পাখি। ছদ্মবেশী স্বভাবের কারণে এদের খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। পাখিটি মাটিতে বসে থাকলে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। সাধারণত উড়ন্ত অবস্থায় না দেখলে এর উপস্থিতি বোঝা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেছেন, ‘২০১৭ সালে দেশে প্রথমবারের মতো রাজশাহীর পদ্মা নদীর চরে এই পাখির দেখা মিলেছিল। দীর্ঘদিন পর ব্রহ্মপুত্রের চরে আবারও এর উপস্থিতি রেকর্ড হওয়া নিঃসন্দেহে আনন্দের খবর। এটি দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য।’

প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা, নিশাচর জীবনযাপন এবং বাংলাদেশে বিরল উপস্থিতি—সব মিলিয়ে সাইক্সের রাতচরা পাখিপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে বিশেষ আগ্রহের একটি প্রজাতি। ব্রহ্মপুত্রের চরে এর সাম্প্রতিক উপস্থিতি দেশের জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যোগ করল। আর মনে করিয়ে দিল, আমাদের চারপাশের প্রকৃতিতে এখনও লুকিয়ে আছে বহু অজানা বিস্ময়।