জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পর এবার চীন সফরে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন মাত্রা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আগামীকাল সোমবার (২২ জুন) বিকেলে মালয়েশিয়া থেকে চীনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে চীন তার কৌশলগত অবস্থান আরও সুসংহত করার চেষ্টা করছে।
চীন সফর শেষেই হাসিনার পতন
২০২৪ সালের ৮ থেকে ১০ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইজিং সফর করেন।
ড. ইউনূসের চীন সফর
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের ২৬-২৯ মার্চ মাসের চীন সফরও ব্যাপক গুরুত্ব পায়। সফরকালে তিনি চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প স্থানান্তর, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদারের বিষয়গুলো সেখানে গুরুত্ব পায়। একইসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হয়।
তারেক রহমানের চীন সফর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উভয় দিক থেকেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিএনপি এখন এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। চীন সফরের মাধ্যমে দলটি বেইজিংয়ের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত অগ্রাধিকার তুলে ধরার সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে দেশে চীনা বিনিয়োগও বাড়াতে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদা জিয়ার চীন সফর
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাধিকবার চীন সফর করেন। চীনের রাষ্ট্রীয় নেতাদের আমন্ত্রণে তিনি ১৯৯১, ২০০২ এবং ২০০৫ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চীন সফর করেছিলেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া চীন সফরে যান। এই সফরের মাধ্যমে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গড়ে তোলা বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাকে তিনি আরও সুদৃঢ় করেন। খালেদা জিয়ার চীন সফরগুলোর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্ব, সমতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক ব্যাপক অংশীদারিত্ব ভিত্তি লাভ করে।
চীনে কেন প্রথম সফর নয়
কূটনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর যদি বেইজিং হতো, তাহলে দিল্লিতে ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। আবার প্রথম সফর যদি ভারত হতো, তাহলে চীনের কাছে তা রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা দিতে পারত।
এমন পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া ঢাকার জন্য একটি নিরাপদ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কোনো পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত এড়াতেই মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এ ছাড়া চীন বরাবরই বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মধ্য দিয়ে বেইজিং স্পষ্টভাবে দেখাতে চায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন যাই হোক না কেন, ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক কৌশলগত পর্যায়ে অব্যাহত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তারেক রহমানের এই সফর শুধু একটি দলীয় সফর নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিন্যাস এবং আঞ্চলিক কূটনীতির প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করতে পারে। একই সঙ্গে সফরটি বিএনপি ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটাতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বাংলানিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা চীন আমাদের উন্নয়ন অংশীদার। এই সফরের মধ্যে দিয়ে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের উন্নয়ন হবে বলে প্রত্যাশা করছি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ করিম বাংলানিউজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে ঘিরে চলমান আলোচনার একটি বড় অংশ এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা এই সফরগুলোর অভিনবত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব উভয়কেই অতিরঞ্জিত করছে। তবে বাস্তবে আমরা যা দেখছি তা আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নয়, বরং একটি দীর্ঘ-প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক ধারার ধারাবাহিকতা—যা ভারসাম্য, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং কৌশলগত নমনীয়তাকে অগ্রাধিকার দেয়।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব সহযোগিতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মধ্যে দিয়ে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আমরা আশা করি। এ ছাড়া আশা করি দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ জুন মালয়েশিয়া সফরে গেছেন। আগামীকাল সোমবার মালয়েশিয়া থেকে চীনে যাবেন তিনি। আগামী ২৬ জুন চীন সফর শেষে দেশে ফিরবেন তারেক রহমান।