আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ‘চিকেনস নেক’ বা ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের দুই অংশের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী এ সরু করিডোর বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত
ভৌগোলিকভাবে এর নিকটবর্তী উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা ঠাকুরগাঁও। এ কারণে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে আলাদা তাৎপর্য রয়েছে এ প্রান্তিক জেলাটির। সেই সঙ্গে বিভিন্ন কালপর্বে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে এ জেলা থেকে উঠে এসেছেন অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা।
আঞ্চলিক পানি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঠাকুরগাঁওয়ের অবস্থান। পঞ্চগড় থেকে কয়েকটি নদী ঠাকুরগাঁওয়ে প্রবেশ করে দিনাজপুর হয়ে অন্যান্য জেলায় প্রবেশ করেছে। যার ফলে তিস্তার ব্যারাজ ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এ প্রান্তিক জেলা থেকে উঠে এসেছেন বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনও ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ে গড়ে ওঠা রাজনীতিবিদ। পাকিস্তান আমলেও এ জেলায় ছিলেন একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পিতা মির্জা রুহুল আমিন।
ঠাকুরগাঁও দেশের এক প্রান্তে অবস্থিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক চরিত্র সেখানকার আলো-বাতাসে বিকশিত হয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক আইনসভায় ১৯৬২-৬৬ সালে পরপর দুবার সদস্য নির্বাচিত হন ঠাকুরগাঁওয়ের মির্জা রুহুল আমিন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভায় কৃষিমন্ত্রী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এবং মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তার পুত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এক দশক ধরে তিনি বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতাপূর্ব রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। আইয়ুববিরোধী অভ্যুত্থানে রাজপথে সরব ছিলেন এ নেতা।
প্রয়াত রমেশ চন্দ্র সেন ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল সময়কালে পানিসম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
রাজনীতিতে ঠাকুরগাঁও জেলার ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ এলাকার মানুষ বরাবরই রাজনীতি সচেতন ছিল। ব্রিটিশ আমলে তেভাগা আন্দোলনে এখানকার মানুষ বড় ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষ করে গুরুদাস তালুকদার, হাজী মোহাম্মদ দানেশ ও বাচ্চা মুন্সীদের মতো অনেকে তেভাগা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একটা সময় জেলায় বাম রাজনীতির প্রভাব বেশ ভালোভাবেই ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এলাকাটি ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের এখানে বিদ্রোহ হয়েছিল। এপ্রিলের ১৪ তারিখ পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও স্বাধীন ছিল।’
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর যারা মোটামুটিভাবে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন তাদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের খাদিমুল ইসলাম। তার মৃত্যুর পর সামনে আসেন রমেশ চন্দ্র সেন। তারও আগে ছিলেন ফজলুল করিম সাহেব। তিনি এমপি এবং গভর্নর ছিলেন। আমার পিতা আগে মুসলিম লীগ করতেন। পরবর্তী সময়ে প্রায় ২৫ বছর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানের সময় তিনি বিএনপিতে যুক্ত হন। ১৯৭৮ সালে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।’
ঠাকুরগাঁও জেলার উত্তরে পঞ্চগড় জেলা, পূর্বে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলা, পশ্চিম ও দক্ষিণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিভিন্ন সময় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশ-ইনের তৎপরতা দেখা গেছে। জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে তিনটির সঙ্গে ভারতের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। এ উপজেলাগুলো হলো রাণীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী ও হরিপুর। সর্বশেষ গত ৫ জুন দিবাগত রাতে হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পুশ-ইনের চেষ্টা করে। তাদের সেই চেষ্টা ঠেকিয়ে দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবি সূত্রে জানা যায়, দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত পিলার ৩৪৯/৭-এস-এর কাছে বিএসএফ ১১ জন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। খবর পেয়ে বিজিবির টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের শনাক্ত করে এবং বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেয়।
এ ঘটনার পর ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোয় বিজিবির সদস্যদের নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়। সে সময় স্থানীয় গ্রামবাসীদেরও স্বেচ্ছায় পাহারায় অংশ নিতে দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে ৪৮ ঘণ্টা পর শূন্যরেখায় অবস্থানরত অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে সরিয়ে নেয় বিএসএফ।
জেলাটির ভূরাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শিলাগুড়ি করিডোরের নিকটবর্তী জেলা পঞ্চগড়। ভারতের চিকেনস নেকের সবচেয়ে কাছে পঞ্চগড়। আর ঠাকুরগাঁওয়ের সঙ্গে সীমান্তটি হলো ওয়েস্টে অর্থাৎ পশ্চিম দিনাজপুর এবং বিহার ঠাকুরগাঁও সীমান্তের কাছাকাছি। ফলে সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় নিঃসন্দেহে একটা ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব তো আছেই।’
ঠাকুরগাঁওয়ের ভৌগোলিক গুরুত্ব ব্রিটিশ শাসনামলেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ১৯৪০ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়। বন্দরটির প্রধান রানওয়ে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার সরকারি ও সামরিক কাজে ব্যবহার করতে বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ভারতীয় বিমান বাহিনী এখানে হামলা চালালে বিমানবন্দরের রানওয়েটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দেশের অন্যতম কৃষি উৎপাদন অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত এ জেলা। প্রতি বছর উৎপাদন হয় বিপুল পরিমাণ ধান, গম, ভুট্টা ও আলু। ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি অর্থনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক বাণিজ্যিকভাবে ফল উৎপাদন। বিশেষ করে আম ও লিচুর ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদন এ অঞ্চলের কৃষিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। মৎস্য চাষ এবং গবাদিপশু উৎপাদনেও ভূমিকা রাখছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এ জেলা।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী জেলার অর্থনীতি নিয়ে বলেন, ‘অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের এলাকাটি মূলত কৃষিপ্রধান। অন্য ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্প খুব একটা নেই। একটি চিনির কল আছে আর কিছু ছোটখাটো রাইস মিল। তবে এরই মধ্যে একটা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে একটা বড় ভূমিকা রাখবে। আমরা মনে করি যে ঠাকুরগাঁওয়ের জনগণকে যদি আরো বেশি শিক্ষিত করা যায়, কৃষকদের যদি সহযোগিতা করা যায় তাহলে জেলার অর্থনীতি একটা গতি পেতে পারে। এছাড়া এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মাণ করা একটা এয়ারপোর্ট আছে। সে এয়ারপোর্টটিকে কাজে লাগাতে পারলেও এর অর্থনীতিতে কিছু গতি সঞ্চার করা সম্ভব। রেলওয়ে লাইন আছে, সে লাইনকে ভালোভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।’
ঠাকুরগাঁও অঞ্চলটির তাৎপর্য রয়েছে যোগাযোগ ও বাণিজ্যেও। ঐতিহাসিকভাবে ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিট এবং অর্থনৈতিক সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এ জেলা সম্ভাব্য হাব হিসেবে বিবেচিত হয়। দুই দেশের মধ্যকার আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসার এবং অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে এর ভৌগোলিক অবস্থান বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।