রাজধানীতে এক ব্যবসায়ীর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে পল্টন থানা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক খলিল মৃধা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। বেশকিছু দিন ধরে দাবি করা এ চাঁদা না পেয়ে অবশেষে ব্যবসায়ীকে প্রথমে তুলে নিয়ে মারধর, পরে জিম্মি করে মুক্তিপণ হিসেবে দুই লাখ টাকা আদায় এবং ব্যাংকের ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। যদিও অভিযুক্ত নেতা অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
গত ৬ জুন সংঘটিত এ ঘটনার পর গত শুক্রবার (১২ জুন) পল্টন মডেল থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী সিবি এক্সপোর্ট ইমপোর্ট লিমিটেডের এমডি মো. নাইম হোসেন। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ আসামি কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি বলে জানা গেছে।
মামলার আসামিরা হলেন- মোঃ ইয়াছিন আরাফাত (২৮), মোঃ খলিল মৃধা ওরফে খলিলুর রহমান (৫৫), রানা সরদার (৪৭), মোঃ আবুল হোসাইন (৪৫), মোঃ শাহাদাত কবির (৩৫), রুবেল (৪২), লিটন (৪২), মোঃ আসলামুল ইসলাম (৬৫), ফরহাদসহ (৪৩) অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী ভুক্তভোগীর ভাষ্য, পুরানা পল্টনের দারুস সালাম আর্কেডের ১০ম তলায় সিবি এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট লিঃ (প্রাইভেট) নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। রানা সরদার ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময় তার অফিসে গিয়ে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদা দাবি ও আদায় করত। গত ৬ জুন দুপুরে খলিল মৃধা তাকে ফোন করে অফিসের নিচে আসতে বললে তিনি তার অফিসের ম্যানেজার হাফিজ আল আসাদকে সাথে নিয়ে ওই ভবনের ২য় তলায় নিয়ে যান। তিনি ও ম্যানেজার সেখানে আসামিদের দেখতে পান। তখন তারা ২০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে।
চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগী ও তার ম্যানেজারকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং সেগুনবাগিচা এলাকায় নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে চাঁদার জন্য হত্যার হুমকি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী নাঈম ও ম্যানেজারের মুক্তিপণ হিসাবে নগদ ২ লক্ষ টাকা চায় আসামিরা। পরে তারা তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অ্যাপসের মাধ্যমে জোরপূর্বক ২ লক্ষ টাকা নিয়ে নেয়। তাছাড়া, তার সিবি এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট লিঃ কোম্পানীর ব্যাংকের তিনটি ফাঁকা চেক ও তিনটি ৩০০ টাকার সাদা স্ট্যাম্পে জোর পূর্বক স্বাক্ষর নেয়। পরে তারা ভুক্তভোগী ও তার ম্যানেজারকে ওইদিন সন্ধ্যায় ছেড়ে দেয়।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নাঈম বলেন, এলাকার কিছু লোক দলীয় (যুবদল) প্রভাব দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছিল। এর মধ্যে, গত ৬ জুন হঠাৎ যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয় দেওয়া খলিল মৃধা আমাকে কল করে অফিসের নিচে আসতে বলেন। পরে আমি ও আমার ম্যানেজার অফিসের দ্বিতীয় তলায়, ব্যবসায়ী সংগঠনের কক্ষে যাই। সেখানে গেলে ১০ থেকে ১২ জন আমাদের ঘিরে ধরে। তারা সবাই যুবদলের নেতাকর্মী পরিচয় দেন। তারা আমার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমি ও আমার ম্যানেজারকে মারধর করে সেগুনবাগিচার আল রাজি কমপ্লেক্সের সামনের একটি ভবনে নিয়ে আটকে রাখে এবং গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।
তিনি বলেন, এক পর্যায়ে আমার মোবাইল বের করে জোরপূর্বক দুই লাখ টাকা তাদের বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে অনলাইনের মাধ্যমে ট্রান্সফার করে নেয়। পরে তিনটি ফাঁকা চেক এবং তিন পাতার অলিখিত নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে, আমাকে বিভিন্ন হুমকিধমকি দিয়ে ছেড়ে দেয়। এই ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে পল্টন থানাকে অবহিত করি। পরে ১২ জুন মামলা করি।
ভুক্তভোগী ব্যক্তি আরও জানান, তাকে আটকে রাখা অবস্থায়, অভিযুক্তদের অনেককে বলতে শোনা যায়, পল্টন থেকে মতিঝিলের সবকিছু তারাই দেখাশুনা করে। পল্টনে ব্যবসা করতে হলে খলিলের সাথে সম্পর্ক রেখে করতে হবে। এ সময় শাহাদাত কবির নামের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় বলে পরিচয় দেয়। তিনি গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে চাকুরীরত।
তাছাড়া, নাইম অভিযোগ করে বলেন, মামলার এজহারে যুবদল শব্দটি বাদ দেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে থানা থেকে এক এসআইয়ের মাধ্যমে চাপ দেন। পরে যুবদল উল্লেখ না করেই মামলা দায়ের করা হয়। আর মামলা নিতে থানার ওসি গড়িমসি করেছেন। কয়েকদিন ঘুরে মামলা করার পর সব তথ্য-প্রমাণ জমা দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসাসিকে ধরতে পারেনি পুলিশ।
অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত পল্টন থানা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক খলিল মৃধা দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, আমি এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। ঘটনার দিন রাস্তায় সিবি এক্সপোর্ট ইমপোর্ট লিমিটেডের লোকদের ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে অন্য পক্ষের ঝামেলা চলছিল। এসময় আমি সাধারণ জনগণ হিসেবে তাদেরকে বলেছিলাম যে, রাস্তায় বাড়াবাড়ি করিয়েন না আপনারা, অফিসে গিয়ে সমাধান করেন। পরে আমি জাতীয় প্রেস ক্লাবের একটি প্রোগ্রামে চলে গিয়েছিলাম। অথচ প্রেস ক্লাবে থাকাকালীন সময়ের কথাই মামলায় উল্লেখ করেছে তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, গত ১২ জুন এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। তবে এ বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
মামলার এজাহারে যুবদল শব্দ না রাখার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কোনো কিছু আমার জানা নাই। অভিযোগকারী অভিযোগ করার পরই তা গ্রহণ করা হয়েছে।