Image description

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার আব্দুল হক ও আলেয়া বেগম দম্পতি দিব্যি চোখে দেখেন। তবে সরকারি ভাতার নথিতে তাঁরা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। গত পাঁচ বছর ধরে ‘সুবর্ণ নাগরিক’ কার্ডে সরকারি ভাতাও তুলছেন। এমনকি ১০ বছর ধরে বিশেষ খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ) নিচ্ছেন দোতলা বাড়ির মালিক এই দম্পতি।

সদর উপজেলার বেতিলা-মিতরা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাংগড়া গ্রামের ওই দম্পতির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা বাড়ির একতলায় থাকেন ওই দম্পতি, আরেক তলায় তাদের মেয়ে। একমাত্র ছেলে প্রায় ১০ বছর ধরে সৌদি আরব প্রবাসী। তাদের আয়ের অন্যতম উৎস গবাদিপশু পালন ও কৃষি কাজ।

‘সুবর্ণ নাগরিক’ কার্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাতার আবেদন করেন আলেয়া বেগম। পরে ‘সুবর্ণ নাগরিক’ পরিচয় সম্বলিত কার্ড পান তিনি, যার আইডি নম্বর ৪৬১৮৪৮৬৭৭৫। এর পরের অর্থবছরে একই কার্ড পান তাঁর স্বামী আব্দুল হক, যার আইডি নম্বর ১০০৯৩০৫৫৮০-০৪। এরপর থেকে নিয়মিত ভাতা নিয়ে আসছেন তারা।

এর আগে ২০১৬ সালে সরকার নির্ধারিত স্বল্প মূল্যের চাল (১০ টাকা কেজি, বর্তমানে ১৫ টাকা) সংগ্রহের ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্ড নেন আব্দুল হক।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের ‘সুবর্ণ নাগরিক’ কার্ড দেয় সমাজসেবা অধিদপ্তর। এজন্য স্থানীয় ইউনিয়ন কমিটির মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। প্রথমে ওয়ার্ড সদস্য সুপারিশ করেন। এরপর ইউপি চেয়ারম্যান হয়ে যায় সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছে। অনুমোদন পেলে কার্ডধারীর মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে প্রতি মাসে ৯০০ টাকা হিসেবে তিন মাস পরপর টাকা যায়।

সদর ইউনিয়নের সদস্য বিল্লাল হোসেনের সুপারিশে আব্দুল হক-আলেয়া দম্পতির কার্ড অনুমোদন দেন তৎকালীন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা লাভলী খানম। এক্ষেত্রে পরিবারে একাধিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী থাকলেও একজন ভাতা পাওয়ার শর্তও মানা হয়নি।

এদিকে সুস্থ ব্যক্তির ভাতা পাওয়ার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে ২০২২ সালে সরেজমিন তদন্ত করেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সমাজকর্মী তাহমিনা সুলতানা। তিনি অভিযোগের প্রমাণ পেয়ে মৌখিকভাবে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্ট্রিম ছবিস্ট্রিম ছবি

সদর উপজেলার তৎকালীন ও বর্তমানে শিবালয়ের সমাজসেবা কার্যালয়ের ইউনিয়ন সমাজকর্মী তাহমিনা সুলতানা বলেন, ‘ভাতাভোগীদের তালিকা মূলত ইউপি সদস্যরা দিয়ে থাকেন, আমরা শুধু সেটি মনিটরিং করি। তবে ওই দম্পতির বিরুদ্ধে এক ব্যক্তি মৌখিকভাবে অভিযোগ করেন। তখন ইউপি কার্যালয়ে ডেকেছিলাম। পরে তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক দেখি। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা লাভলী খানমকে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। পাশাপাশি স্থানীয় ইউপি সদস্য বিল্লাল হোসেন তাদের ভাতা যেন বন্ধ না হয়, এ জন্য তদবির করেছিলেন।’

‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী’ ভাতা নেওয়ার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে আলেয়া বেগম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁর স্বামী আব্দুল হক প্রথমে দাবি করেন, ‘আমি কোনো ভাতা পাই না, এসব মিথ্যা কথা।’

তবে তাঁর নামে দেওয়া ‘সুবর্ণ নাগরিক’ ও তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে ভাতার টাকা পাওয়ার প্রমাণাদি দেখালে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। পরে তিনি বলেন, ‘আমি অসহায় মানুষ, আমাকে সামান্য কিছু টাকা দেয়।’

তবে কীভাবে সুস্থ হয়েও ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাতা এবং ওএমএস চালের কার্ড পেলেন তার কোনো উত্তর দিতে চাননি তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংগড়া গ্রামে একজন বলেন, আব্দুল হক ও তাঁর স্ত্রী আলেয়া বেগমকে দেখে সুস্থ মানুষ মনে হয়, তাঁরা আর্থিকভাবেও সচ্ছল। তারপরও ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধী’ ভাতা ও স্বল্প মূল্যে চাল পান। এসব সরকারি সুবিধা পাওয়ার পেছনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হাত রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে বেতিলা-মিতরা ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘একজন সুস্থ মানুষ কীভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সেজে ভাতা গ্রহণ করছেন, তা আমারও প্রশ্ন। এর সঙ্গে সমাজসেবা কার্যালয়ের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা জড়িত থাকতে পারেন।’

বেতিলা-মিতরা ইউপি চেয়ারম্যান আসমত আলী বলেন, ‘আমি ভাতার বিষয়টি শুনেছি। অভিযুক্ত ভাতা গ্রহীতাদের সঙ্গে স্থানীয় ইউপি সদস্যদের যোগাযোগ বেশ ভালো। এর চেয়ে বেশি কিছু আমার জানা নেই।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে তৎকালীন সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা লাভলী খানমের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে দুই সপ্তাহ ধরে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন দপ্তর ও জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ পর নড়েচড়ে বসেন কর্মকর্তারা। গত ৭ জুন তাদের ভাতা সাময়িক স্থগিতের তথ্য জানিয়েছেন উপজেলার বর্তমান সমাজসেবা কর্মকর্তা রুশিয়া আক্তার।

স্ট্রিম ছবিস্ট্রিম ছবি

তিনি বলেন, অভিযুক্তদের যে ‘সুবর্ণ নাগরিক’ কার্ডের মাধ্যমে ভাতা দেওয়া হচ্ছে, তা আমার যোগদানের আগেই ইস্যু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এই দম্পতির ভাতার ক্ষেত্রে অসংগতি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

শাস্তি হতে পারে দম্পতির

দপ্তরিত জালিয়াতির বিষয়ে মানিকগঞ্জে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, এটি কেবল জালিয়াতি বা প্রতারণা নয়, বরং সাধারণ মানুষের হকের পরিপন্থি। এ ধরনের ভাতা দেওয়ার পেছনে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও দায়িত্বে থাকা সমাজকর্মীদের যোগসাজশ প্রমাণ করে যে, মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং (তদারকি) ব্যবস্থা কতটা দুর্বল। এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন জালিয়াতির সাহস না পায়।

মানিকগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম এম শফিউল আজম বলেন, বিষয়টি দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণা ও ৪৬৮ ধারায় জালিয়াতির শামিল, যা গুরুতর অপরাধ। এ ছাড়া সহায়তাকারী কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এটি দণ্ডবিধির ১৬৬ ও ১৬৭ ধারায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও নথি জালিয়াতির শামিল। এই বিষয়টি শুধু অনৈতিক নয়, এটি রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাতের শামিল। শুধু ভাতা স্থগিত করাই যথেষ্ট নয়, এ পর্যন্ত আত্মসাৎ করা সরকারি অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা ও জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রোকন উদ্দিন ভূঞা বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।