দেশে গত ১৫ বছরে ঘোষিত ১৫টি জাতীয় বাজেটের মধ্যে ১১টিতেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি সরকার। অর্থমন্ত্রীদের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বছর শেষে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ শতাংশ পর্যন্ত। এতে করে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, সঞ্চয়শূন্য হয়ে পড়ছে বহু পরিবার।
মাসের প্রথম সপ্তাহ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আব্দুল করিমের মোবাইলে বেতনের মেসেজ আসে। বাজারদরের তুলনায় টাকার অঙ্কটা খুশি হওয়ার মতো কিছু নয়।
কয়েক বছর ধরে প্রায় একই জায়গায় থেমে আছে তার বেতন। একই পরিমাণ টাকা খরচ করেও ক্রমেই বাজারের ব্যাগের আকার আরও ছোট হয়ে আসছে। অফিস থেকে সম্প্রতি বেতন কিছুটা বাড়ানোর ঘোষণা এলেও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না।
প্রতিবছর বাজেটে অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু বাস্তবে বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। একাধিক বার সরকার ও অর্থমন্ত্রী বদল হলেও পরিস্থিতি বদলায়নি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাজেহাল হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ক্রমেই সঞ্চয়শূন্য হয়ে পড়ছেন অনেকে।
বিগত ১৫ বাজেটে অর্থমন্ত্রীদের মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি এবং বছর শেষের প্রকৃত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখেছে এশিয়া পোস্ট। এতে দেখা গেছে, ২০১১-১২ থেকে ২০২৫-২৬, এই ১৫ বাজেটের ১১টিতেই পণ্যের বিপরীতে টাকার মূল্যমান বাঁচানোর লড়াইয়ে হেরে গেছেন অর্থমন্ত্রীরা।
এই সময়ে বেশির ভাগ বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য সাড়ে পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় শতাংশের মধ্যে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অথচ অর্থবছর শেষে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা সাত থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গেছে।
অর্থমন্ত্রীদের এই লাগাতার ব্যর্থতার পেছনে আমলাদের কারচুপি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা।
১০ বছরের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, গত দুই দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি সবচেয়ে ভালো ছিল ২০০১ সালে। সে সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ২ শতাংশ। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১১ শতাংশে।
মাঝে কয়েক বছর অর্থমন্ত্রীরা লক্ষ্যের কাছাকাছি গেলেও ২০১৮ সালের পর পরিস্থিতি ক্রমেই টালমাটাল হয়ে ওঠে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদের শুরুতে (২০১১-১২) তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ঘরে আটকে রাখার ঘোষণা দেন। কিন্তু অর্থবছর শেষে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি পৌঁছায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশে।
পরের বছর লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশের ঘরে আটকে রাখার ঘোষণা দিয়ে তা রক্ষা করতে পেরেছিলেন তিনি। বছর শেষে মূল্যস্ফীতি হয় ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৮ সালে সামান্য ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়। এই চার বাজেটই ঘোষণা করেছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত।
ব্যবধান বাড়ছেই
২০১১ সালের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ঘরে আনার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা দিলেও প্রকৃত মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও দেশে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি হয়ে যায়। ২০১৪ সালেও মূল্যস্ফীতি ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২ শতাংশ বেশি হয়।
২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে অবশ্য বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বছর শেষে প্রকৃত মূল্যস্ফীতির ব্যবধান অনেকটা কমে আসে। এই সময় লক্ষ্যমাত্রা ও অর্জিত ফলাফলের ব্যবধান দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে, যা তুলনামূলক স্থিতিশীল পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছর ধরে এই ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে। করোনার বৈশ্বিক মহামারির পর ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু বছর শেষে তা ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
পরবর্তী বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি কমবেশি ১০ শতাংশের ঘরে গিয়ে পৌঁছায়। এ সময় অর্থমন্ত্রীদের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৯, ৪ দশমিক শূন্য এবং সর্বশেষ ২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি ব্যবধান তৈরি করে।
সার্বিক তথ্য-উপাত্ত বলছে, গত ১৫ বছরে বাজেট বক্তৃতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার গড় ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু বছর শেষে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি হয়েছে গড়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রকৃত পরিস্থিতির চেয়ে গড়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ কমিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রীরা।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার জন্য আমলাদের দায়ী করেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব আলী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় আমলারা ইচ্ছা করে বাজেটে এ ধরনের পপুলার কিছু ঘোষণা রাখেন। যেটা আসলে কখনো বাস্তবায়িত হয় না।’
তথ্যের গরমিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যখন মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে থাকে তখন ১ শতাংশ কমিয়ে দেখায় বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার যখন দুই অঙ্কের ঘরে চলে যায় তখন ২ শতাংশ কমিয়ে দেখানো হয়। যেমন—১২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হচ্ছে, তারা দেখালো ১০ শতাংশ। তাহলে যেটা বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিবিএস (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) ঘোষণা করছে সেটাতেও গরমিল আছে।’
এই গরমিলের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রীদের উচ্চাভিলাষী বাগাড়ম্বরকেও দায়ী মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় থাকে তারা মনে করে জনগণকে তারা যা বলবে তাই গিলবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখালে মানুষ ভয় পেয়ে যায়, দ্রব্যমূল্যের সমস্যা তৈরি হয়। সেজন্য ইচ্ছা করেই কমিয়ে দেখায়। এক্ষেত্রে আমলাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকে যেন নেতিবাচক রিপোর্ট না হয়, সেজন্য সবসময় কমিয়ে দেখায়। আমলাদের এই কারচুপির ফলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বাজেটকে ব্যবহার করতে আরও উৎসাহিত হয়। ফলে সত্যিকার অর্থে বাজেট দেশের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’
সঞ্চয়শূন্য বহু পরিবার
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ (২০২২) খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, একটি শহুরে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয় ৪১ হাজার টাকার বেশি, গ্রামাঞ্চলে যা প্রায় ২৭ হাজার টাকা। সার্বিকভাবে আব্দুল করিমের মতো একটি পরিবার মাসে গড়ে সাড়ে ৩১ হাজার টাকা ব্যয় করে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে এই খরচ ২০২২ সালের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ছিল।
করিমের মতো নিম্নমধ্যবিত্ত একটি পরিবারে চাল-ডাল, সবজি, বাসা ভাড়া ও বাচ্চার স্কুলের খরচ মিলিয়ে মাসে গড়ে ব্যয় হয় সাড়ে ৩১ হাজার টাকা। সরকার বাজেটে যে মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, বাস্তবে তার চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি মূল্যস্ফীতি হলে করিম সাহেবের পকেট থেকে মাসে অতিরিক্ত খরচ হয় ১২৬০ টাকা।

হিসাবটা শুনতে ছোট লাগলেও বছর শেষে এই বাড়তি খরচ দাঁড়ায় ১৫ হাজার টাকার বেশি, যা দিয়ে একটি গ্রামীণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের পুরো একমাসের সংসার খরচ চলে যায়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের এক যৌথ জরিপে উঠে এসেছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় ঋণগ্রস্ত হয়ে তীব্র আর্থিক সংকটে ভুগছে। তাদের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪০ শতাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার, যাদের মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কম কিন্তু ব্যয় ১৭ হাজার টাকার বেশি।
নতুন বাজেটেও পুরোনো শঙ্কা
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যদিও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব আলী। তার প্রশ্ন, ‘অর্থমন্ত্রী বলছেন মূল্যস্ফীতি কমাবেন। ঠিক আছে। মুদ্রাস্ফীতি কমলে সেটা অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু তিনি কীভাবে কমাবেন? এজন্য সরকারের কোনো রোডম্যাপ বা দিকনির্দেশনা নেই। উল্টো সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে। ১৩-১৫ লাখ লোকের জন্য আড়াই কোটি চাকরিজীবী বিপদে পড়ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো কাঠামো বা পদ্ধতিও এখানে দেখা যাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী যে স্বপ্ন জনগণকে দেখাচ্ছেন তার বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না।’