Image description

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইনের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং সীমান্তসংলগ্ন বাসিন্দাদের তীব্র প্রতিরোধে বারবার ব্যর্থ হয়েছে তারা। এই পরিস্থিতিতে পুশইনের জন্য সহজে নজরদারি করা যায় এমন সীমান্ত এড়িয়ে বিএসএফ এখন সম্পূর্ণ নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। অনুপ্রবেশের জন্য তারা বেছে নিচ্ছে নদীর পার্শ্ববর্তী চরাঞ্চল আর সমতল দুর্গম এলাকাগুলোকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত কিছু দুর্বলতাকেই এখন নতুন রুট বা হাতিয়ার বানাতে চাইছে বিএসএফ।

জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর সীমান্তের প্রায় ৭২ কিলোমিটার এলাকার বড় অংশই ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম। চারপাশে বিস্তীর্ণ সমতল, নদী-নালা আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল যেন অনুপ্রবেশের পথকে আরও সহজ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সীমান্তে নিজস্ব অংশে কোথাও কাঁটাতারের বেড়া নেই, আবার কোথাও অন্ধকারে ডুবে থাকা সীমান্ত, আবার কোথাও নদী আর দুর্গম অঞ্চল হয়ে উঠেছে নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ। এখন নতুন কৌশল হিসেবে বিএসএফ সেটাকেই কাজে লাগাচ্ছেন।

সীমান্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সূত্র, স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েক দিন সীমান্ত ঘুরে জানা গেছে, কৌশল পরিবর্তনের আগে বিএসএফ মূলত সমতল সীমান্ত এলাকাগুলোকে পুশইনের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করত। তখন তাদের পুশইনের একটি সুনির্দিষ্ট ছক ছিল। প্রথমত, রাতের অন্ধকারে বিএসএফ সদস্যরা ট্রাকে করে পুশইনের উদ্দেশ্যে চিহ্নিত ব্যক্তিদের নিয়ে সীমান্ত ঘেঁষে এসে দাঁড়াত। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় সীমান্তে থাকা তাদের নিজস্ব শক্তিশালী ফ্লাডলাইটগুলো হুট করে বন্ধ করে দেওয়া হতো। মুহূর্তের মধ্যে পুরো সীমান্ত এলাকা ঘুটঘুটে অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার এই সুযোগটিকেই তারা কাজে লাগাত। এরপর কাঁটাতারের গেট খুলে বা অরক্ষিত অংশ দিয়ে জোরপূর্বক মানুষকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হতো।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সমতল সীমান্তগুলোতে বিজিবির কড়া নজরদারি, নিয়মিত টহল বৃদ্ধি এবং সীমান্তসংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের লাঠিসোঁটা নিয়ে রাত জেগে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কারণে বিএসএফের এই ট্রাক ও লাইট বন্ধের পুরোনো কৌশলটি পুরোপুরি মাঠে মারা যায়। আর এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার পরই বিএসএফ তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। নজরদারির আড়ালে যেতে তারা এখন বেছে নিয়েছে জামালপুর ও কুড়িগ্রামের নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, চরাঞ্চল ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম সমতল সীমান্তকে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত এই সীমাবদ্ধতাকেই এখন অনুপ্রবেশের প্রধান অস্ত্র বানাতে চাইছে ভারতীয় বাহিনী।

এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন করে গত সোমবার (১৫ জুন) রাতে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে নতুন পথে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। সোমবার রাতে ভারতের ১৬০ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের অধীন দরগাপাড়া ক্যাম্পের সদস্যরা সীমান্তের কাঁটাতারের গেট খুলে দেয়। এরপর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের পাশ দিয়ে এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে টেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা।

বিষয়টি টের পেয়ে ঝাউডাঙ্গা বিওপির বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারাও লাঠিসোঁটা নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেন। বিজিবির কড়া অবস্থানের কারণে ওই ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে ওই ব্যাক্তি আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন।

সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের অভিযোগ, যেসব দুর্গম পয়েন্টে বাংলাদেশের অংশে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ও নজরদারির ঘাটতি রয়েছে, ঠিক সেখানেই রাতে সুকৌশলে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। ভারতের সীমান্তে বহু এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও তারা ফ্লাডলাইট কখন বন্ধ করে এবং কখন রাতের অন্ধকারে মানুষ ঠেলে দেয়, তা বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় অনেকেই বলেন, এই সীমান্ত অঞ্চলগুলোর চলাচলের জন্য রাস্তার অবস্থা এতটাই নাজুক যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক চলাচল করাই এক প্রকার অসম্ভব। আমরা চাইলেই এক জায়গা থেকে দ্রুত অন্য জায়গায় যেতে পারি না। আজ এই মানবিক সংকটের সংবাদ সংগ্রহ করতে আমাকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই প্রত্যন্ত সীমান্তে আসতে হয়েছে।

এছাড়াও যোগাযোগের এই চরম অব্যবস্থাপনা ও রাস্তার খারাপ অবস্থার সুযোগটিই মূলত বিএসএফ কাজে লাগাচ্ছে। তারা জানে, কোনো পয়েন্ট দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করলে দুর্গমতার কারণে বিজিবি বা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। এই ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত বিচ্ছিন্নতাই এখন পুশইনের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, ভারত যেমন নিজের সীমান্ত সুরক্ষায় ফ্লাডলাইট, আধুনিক রাস্তা ও কাঁটাতারের ব্যাপক অবকাঠামো গড়ে তুলেছে, তেমনি বাংলাদেশকেও এই ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিজস্ব কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত সড়ক, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান তাদের।

তবে শুধু পাহারা বাড়িয়ে এই অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, কয়েক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত শুধু সীমিত জনবল দিয়ে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। বিএসএফের এই কৌশলগত অনুপ্রবেশ রুখতে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক মোস্তাকিম আকাশ বলেন, আমাদের বর্ডারে তো সিকিউরিটির ঘাটতি আছেই, বর্ডারটা অনেকটাই ইনসিকিউরড। এখানে আমাদের নিজস্ব সীমানা বেড়া নেই এবং আমাদের এক ধরনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও ছিল। আর দ্বিতীয়ত, আমাদের ডিপ্লোমেসি বা কূটনীতি খুবই দুর্বল। এই দুর্বলতার কারণেই আমরা আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের অবস্থানটা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছি না।

শীর্ষনিউজ