নরসিংদীর রায়পুরায় একই পরিবারের ছয় সদস্য প্রতিবন্ধী। মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা । ভাঙা ও জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করা এই পরিবারের দিন কাটছে চরম কষ্টে। বৃষ্টিতে পোহাতে হয় অসনীয় ভোগান্তি, নেই পর্যাপ্ত খাবার। শরীরে চিকিৎসার করানোর নেই প্রয়োজনীয় অর্থকড়িও । মানবিক সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশায় দিন পার করছেন স্বামী পরিত্যক্তা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হারেছা বেগম ।
রায়পুরা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পূবেরচর গ্রামের আড্ডাদার বাড়িতে বসবাস করেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই হারেছা বেগম। স্থানীয়রা জানান, মরিচাধরা টিনের ছোট্ট একটি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারটি। ঘরের টিনে অসংখ্য ছিদ্র । যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর হয় হারেছা বেগমের স্বামী ফজর আলী মারা যান। এরপর থেকেই পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। বর্তমানে হারেছা বেগমের সঙ্গে বসবাস করছেন তার জন্মান্ধ মেয়ে সুরাইয়া বেগম, শারীরিক প্রতিবন্ধী জামাতা মরম আলী এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তিন নাতি-নাতনি—মদিনা পাখি, আব্দুর শুক্কুর ও তাসনিম । পরিবারের ছয় সদস্যই কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধীর শিকার।
হারেছা বেগম জানান, অন্ধ মানুষ, ঠিকমতো পথ ঘাট দেখি না । তাই চলাফেরা করতেও পারি না। বয়সের কারণে শরীরও ভালো না। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি হলে ঘরের বাইরে বৃষ্টি পড়ার আগে ভেতরে পড়ে । তাই থাকা যায় না। যদি একটা ভালো ঘর হতো, তাহলে বাকি জীবনটা পরিবারদের নিয়ে একটু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুরাইয়া বেগম জানান, মা, তিন সন্তান আর স্বামীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমার স্বামীও শারীরিক প্রতিবন্ধী। সংসারে আয়-রোজগারের কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। ভাঙা ঘরে বসবাস করছি। সরকার বা সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমাদের দিকে একটু সুনজর দিতেন, তাহলে অনেক উপকার হতো।
পরিবারটির দুরবস্থার খবর পেয়ে খোঁজখবর নিতে ও আর্থিক সহায়তা দিতে বাড়িতে যান রায়পুরা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী ফোরামের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম (সালাম), সিনিয়র সহসভাপতি আতাউর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মিলন ও ওয়াহিদ খন্দকার, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক সাহেদুল আলম শান্ত এবং সমাজসেবক হুমায়ুন কবিরসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। এই পরিবারটির জন্য সরকারি আবাসন, চিকিৎসা সহায়তা এবং স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব হবে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ মিয়া জানান, পরিবারটির সবাই প্রতিবন্ধী হওয়ায়, তাদের জীবনযুদ্ধ অনেক কঠিন। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেলে তারা কিছুটা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। প্রতিবন্ধী ভাতার সামান্য টাকায় সংসার চলে না। স্থানীয়দের সহায়তায় কোনোভাবে বেঁচে আছেন তারা।
রায়পুরা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী ফোরামের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, একই পরিবারের ছয়জন প্রতিবন্ধী সদস্যের বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আমরা তাদের পরিস্থিতি দেখেছি। কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে কথা হয়েছে। অন্তত জরাজীর্ণ ঘরটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি। শুধু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহায়তা যথেষ্ট নয়।
এ বিষয়ে রায়পুরা উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপজেলা কর্মকর্তা খলিলুর রহমান সজিব জানান, এই পরিবারের সদস্যরা প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার কথা শুনেছি। তবে এদের কেউ বাকি আছে কি না জানি না। কেউ বাকি থাকলে তাদেরও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে ও পরিবারটির খোঁজ নিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন পূবর্ক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ দ্রুতই নেওয়া হবে।