অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন-সরকারের এই বার্তাই প্রতিষ্ঠিত হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইন্টারপোলের কাছে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার হওয়ার মাধ্যমে।
সোমবার (১৫ জুন) পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোকে (এনসিবি) গত ১২ জুন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ই-মেইলের মাধ্যমে অবহিত করে আবুধাবির এনসিবি।
পুলিশের অপর একটি সূত্রে জানা যায়, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে ইন্টারপোলের সহায়তায় গ্রেপ্তারের পর আবুধাবির এনসিবি বাংলাদেশের এনসিবির কাছে একটি চিঠি পাঠায়।
গত রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, ইউএই ফেডারেল ল-এর ৩৯ (২০০৬) ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ বা এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এনসিবি ঢাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করছে। শিগগিরই কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারকে আইনের শাসনের মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারছি। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন-এই বার্তাটি আমরা জাতিকে দিতে চাই।
এদিকে দুপুরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতিসংক্রান্ত সব নথিপত্র গোছানো হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে এসব নথি দ্রুত পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আকতারুল ইসলাম বলেন, দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সব নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ চলছে।
বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশকে পাঠানো চিঠিতে যা ছিল
সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরত আনতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছে দেশটির ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি), আবুধাবি।
১২ জুন এনসিবি, আবুধাবি থেকে ঢাকার এনসিবির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ নম্বর A-5174/4-2025-এর আওতাভুক্ত বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, গ্রেপ্তারের পর তাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপন করা হলে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশকে কূটনৈতিক মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ (Extradition) আবেদন পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত আইনের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যর্পণের আবেদন কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক মাধ্যমে লিখিত আকারে জমা দিতে হবে। আবেদনের সঙ্গে আরবি ভাষায় অনূদিত, যথাযথভাবে স্বাক্ষরিত ও সিলমোহরযুক্ত বিভিন্ন নথি সংযুক্ত করতে হবে।
প্রয়োজনীয় নথির মধ্যে রয়েছে অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় ও জাতীয়তা-সংক্রান্ত তথ্য, ছবি ও বর্ণনা, অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনের ধারা ও শাস্তির বিবরণ, আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপি, মামলার ঘটনার বিবরণ, তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রয়োজন হলে আদালতের রায় ও তা কার্যকরযোগ্য হওয়ার প্রমাণপত্র।
চিঠিতে এনসিবি, আবুধাবি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠিয়ে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে।
দুদকের ছয় মামলা
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার বিচার চলছে এবং পাঁচটি তদন্তাধীন।
বিচারাধীন মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
দুদকের করা ছয় মামলার মধ্যে তিনটিতে প্রধান আসামি বেনজীর আহমেদ। অন্য তিনটি মামলায় তার স্ত্রী জীশান মির্জা এবং দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় সহযোগী আসামি হিসেবে রয়েছেন বেনজীর আহমেদ।
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি), সাবেক ডিএমপি কমিশনার এবং সাবেক র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর।
দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ তার নামে ও স্বজনদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাগানবাড়ি, মাছের খামার এবং অন্যান্য সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিষয়টি জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও অভিযোগগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে।
অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনের প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন দৈনিক কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী।
একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গোপনে দেশ ত্যাগ করেন।
২০২৪ সালের ১২ জুন আদালত বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও সন্তানদের নামে থাকা ৮টি ফ্ল্যাট এবং ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি ক্রোকের আদেশ দেন। জব্দ হওয়া ফ্ল্যাটগুলো ঢাকার বাড্ডা ও আদাবর এলাকায় এবং জমিগুলো নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরায় অবস্থিত।
পরে পৃথক দুই আদেশে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার এবং গুলশানে থাকা আরও ৪টি ফ্ল্যাট ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়াও তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং শেয়ার লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩টি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন আদালত।
এদিকে সোমবার (১৫ জুন) সন্ধ্যার পর ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে রেড নোটিশের তালিকায় দেখা যায়, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৬,৪৪২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক ৫৯ জন। বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন ঢালি রাজু, এমডি মিলন, কালা জাহাঙ্গীরসহ আরও অনেকে।
পুলিশ সদর দপ্তর গত বছরের এপ্রিল মাসে নতুন করে আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনাসহ বেনজীর আহমেদ এবং আরও ১২ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির জন্য চিঠি পাঠিয়েছিল।
১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেন বেনজীর আহমেদ। এ বাহিনীতে দীর্ঘ কর্মপরিসরের ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি পদে ছিলেন। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালকেরও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ইন্টারপোলের সব রেড নোটিশ প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয় না। সদস্য রাষ্ট্রের অনুরোধ বা তদন্তের স্বার্থে অনেক ক্ষেত্রে নোটিশ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর জন্য সংরক্ষিত থাকে। বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।