নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেলসেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার মুখে মাটি কাটার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অভিযোগ উঠেছে, একটি মহল সেতুর নিচের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে সেতুটি ঝুঁকির মুখে পড়বে। তবে সেতুর আশেপাশের মাটি কাটার অনুমতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দফতর জানিয়েছে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, পদ্মা সেতুর নিচে ও পাশ থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। তবে কে বা কারা এই মাটি নিয়ে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা হয়নি ভিডিওতে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, আলীগঞ্জে অবস্থিত পদ্মা রেলসেতুর পিলারের নিচে ও একপাশের মাটি কেটে নেওয়ার চিহ্ন দেখা গেছে। সেতুটির ৮৫, ৮৬ ও ৮৭ নম্বর পিলারের আশপাশের মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। এতে বিশাল বড় গর্ত তৈরি হয়ে পানি জমেছে। তবে আপাতত মাটি কাটার কাজ বন্ধ আছে।
অভিযোগ উঠেছে, একটি মহল সেতুর নিচের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছে
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুতুবপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার আবুবক্কর ও তার অনুসারীরা সেতুর পিলারের গোঁড়া থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছেন। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে কুতুবপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আবুবক্কর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি সেখান থেকে মাটি কেটে নিইনি। ফতুল্লার কিছু লোকজন কেটে নিয়েছেন। আমার জানামতে, মাটি কাটার অনুমতি আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেতুর নিচে মাটি কাটার জন্য চীনের এক কোম্পানি টেন্ডার দিলে ঢাকার এক ব্যক্তি টেন্ডার পেয়েছিল। পরে তার সঙ্গে মিলে কাজ শুরু করলে এলাকার লোকজন বাধা দেন। তখন আর মাটি কাটিনি। এটা প্রায় দুই বছর আগের ঘটনা। এখন নতুন করে ফতুল্লার সাগর, ছিদ্দিক ও তার লোকজন মাটি কাটছেন।’
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের টিম সেখানে গিয়ে কথা বলেছে। পরে তারা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেছেন। রেলওয়ের লোকজন, মাটি কাটার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ আর্মির ইঞ্জিনিয়ারিং কোড- এই তিনটা প্রতিষ্ঠান জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেছে। এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা ভালো বলতে পারবেন জেলা প্রশাসক।’
এখন মাটি কাটার কাজ চলছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। এছাড়া মাটি কাটা ব্যক্তিদের বিষয়েও আমার কিছু জানা নেই।’
ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রেলওয়ে প্রকল্পের অধীনে এই কাজ হয়েছে। এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানে। প্রথম দিকে আমরা গিয়ে সেখানে মাটি কাটার কাজ বন্ধ রেখেছিলাম। পরে তারা এটা নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মিটিং করেছেন বলে শুনেছি।’
পদ্মা সেতুর নিচে ও পাশ থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে
এ ব্যাপারে জানতে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ থেকে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে এমন কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে প্রকল্পের পক্ষ থেকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই।’
মাটি কাটার অনুমতি আছে দাবি করে পদ্মা রেলিং প্রজেক্টের ব্রিজ অ্যান্ড ভায়াডাক্ট ইঞ্জিনিয়ার আমিনুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেলসেতুর পিলারের নিচ থেকে অনুমতি নিয়েই মাটি কাটা হয়েছে। পিলার নম্বর ৭৬ থেকে ৯০ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিটার দৈর্ঘ্যের স্থানে কাটা হচ্ছে, যা আগে জলাশয় ছিল। চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির কন্ট্রাক্টর মাটি ও বালু দিয়ে ভরাট করে ভায়াডাক্ট নির্মাণকাজ শেষ করেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ওই অঞ্চলে আগের মতো জলাশয় খনন করা হচ্ছিল। এটা এই প্রকল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশবান্ধব নির্দেশিকা। এক কথায়, কাজের সুবিধার জন্য এখানে মাটি ভরাট করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে কেটে দেওয়ার নির্দেশনা আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি মাটি কাটার ঘটনাটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা মোটেও ঠিক নয়। কিছু স্বার্থন্বেষী মহল নিজেদের লাভের জন্য অপপ্রচার চালাচ্ছে। এখানে জলাশয় থাকবে সেই অনুসারে ডিজাইন করা হয়েছে। এই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। যেহেতু ভূমির গভীরতা বিবেচনায় স্ট্রাকচারাল ডিজাইন অনুসারে পাইল, পাইল ক্যাপের ভিত্তির ওপর অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, যা পিলারের কোনও প্রকার ক্ষতি করবে না।’