Image description

একসময় যার পৃথিবী জুড়ে ছিল শুধু মা, সেই সোমাইয়া ইসলাম নওমী আজ দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে স্বপ্ন তাকে ঘিরে লালন করেছিলেন মা সোহেলী ইসলাম সোমা, সেই স্বপ্ন এখন থমকে গেছে মায়ের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায়।

পরিবারের ভাষ্য, প্রায় দুই দশক আগে স্বামী মো. রনির সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একমাত্র মেয়ে নওমীকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন উচ্চশিক্ষিত সোহেলী ইসলাম সোমা। মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে তিনি রাজধানীতে পাড়ি জমান এবং এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি নেন। ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় মা-মেয়ে একসঙ্গে বসবাস করতেন। সোমার উপার্জনেই চলত নওমীর লেখাপড়া ও সংসার।

মেধাবী শিক্ষার্থী নওমী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত একটি কলেজের ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে তার শিক্ষাজীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানালেন, অনেক আগে থেকেই বাবার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত নওমী। বিচ্ছেদের পর তার বাবা অন্যত্র সংসার গড়ে তুলেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে মেয়ের খোঁজখবরও নেন না। যার ফলে নওমীর উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করার মতো নির্ভরযোগ্য কেউই এখন নেই।

দিনাজপুরের পার্বতীপুর পৌর শহরের সাহেবপাড়া রেল কলোনি এলাকার প্রতিবেশী ব্যবসায়ী বেনজামিন দাস বুলবুল ও আব্দুল্লাহ বলছিলেন, বিচ্ছেদের পর সোমা অত্যন্ত কষ্ট করে মেয়েকে বড় করেছেন। বাবা তাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নওমীর সব দায়িত্ব একাই বহন করেছেন তিনি। মা হীন নওমীর দায়িত্ব কে নেবে?  বর্তমান পরিস্থিতিতে নওমীর মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

নওমীর চাচা মো. ফরিদ জানান, ৬ জুন পার্বতীপুর থেকে হক এন্টারপ্রাইজের একটি নাইট কোচে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন সোমা। পরদিন ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনালে পৌঁছে অটোরিকশাযোগে বাসায় ফেরার পথে মোহাম্মদপুর ও আসাদগেটের মাঝামাঝি এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীরা তার ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ব্যাগ টানাটানির একপর্যায়ে তিনি সড়কের পাশের ডিভাইডারে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান।

 

পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। বৃহস্পতিবার ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

নিহতের ফুফাতো ভাই সরোয়ার পারভেজ সবুজ বললেন, সোমার বাবা-মা বহু বছর আগে মারা গেছেন। তিন বোনের মধ্যে বড় ছিলেন তিনি। নিজের সংগ্রামী জীবনের মধ্যেও ছোট দুই বোনের লেখাপড়া ও বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি গড়ে তোলার আগেই তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো।

পরিবার বলছে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সোহেলী ইসলাম সোমার মরদেহ পাবনার ঈশ্বরদী পৌরসভার পশ্চিম টেংরি মহল্লায় নেওয়া হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

স্বজনদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে আর্থিক সংকটে নওমীর উচ্চশিক্ষার পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই তার শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা কামনা করেছেন তারা।