দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। ব্যবসা-বাণিজ্যের এই মহাযজ্ঞের মধ্যে অনিয়মই যেন নিয়মে রূপ নিয়েছে দেশের প্রধানতম সমুদ্রবন্দরটিতে।
প্রতিনিয়ত হচ্ছে টেন্ডার ছাড়াই জমি ও স্থাপনার ইজারা। বন্দরের নানান অপারেশনের কাজও চলছে টেন্ডারবিহীন। চলমান এসব অনিয়মের মধ্যেই বন্দর চেয়ারম্যানের দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে-পরে চট্টগ্রাম বন্দরের নানান কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বন্দরে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও অপারেশনাল সংক্রান্ত কার্যক্রমের অনেক ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানা হয় না।
সুতা ব্যবসায়ীকে আমদানিকারক সাজিয়ে জমি ইজারা
নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন চাক্তাই আছদগঞ্জ এলাকার সুজাকাঠগড় মৌজায় নিজেদের ২৪ শতাংশ জমি ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী ভাড়ায় ইজারা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০২৪ সালের শুরুতেও আবেদন করে বরাদ্দ পেতে ব্যর্থ হন সুব্রত মহাজন নামে এক ব্যক্তি। বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান যোগদানের পর জায়গাটি বরাদ্দ পেতে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পুনরায় বন্দর চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেন সুব্রত মহাজন।
পূবালী ট্রেডার্সের নামে একটি প্যাডে আবেদনকারী হিসেবে সুব্রত মহাজনের সঙ্গে মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক সুতা ব্যবসায়ীকেও রাখা হয়। কিন্তু আবেদনে মেসার্স পূবালী টেডার্স ও মেসার্স রহমান ট্রেডিং উভয়ের মাধ্যমে বহু বছর ধরে বন্দর সংশ্লিষ্ট আমদানি করা খাদ্যশস্য ডাল, গম, চনা, ভুট্টা ইত্যাদি মালামাল সংরক্ষণ ও সরবরাহ করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর
ওই আবেদনের মাত্র ছয়দিনের মাথায় জায়গাটি বরাদ্দ অনুমোদন দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২৯ সেপ্টেম্বরের বোর্ড সভায় জায়গাটি বরাদ্দ অনুমোদন দেন বন্দর চেয়ারম্যান। বোর্ড সভার এজেন্ডার সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়- ‘নৌ-উপদেষ্টা (অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা) মহোদয় উল্লেখিত জায়গা অস্থায়ীভাবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে স্পেস রেন্টের ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে চেয়ারম্যান/চবক মহোদয়কে নির্দেশনা প্রদান করেন।’ তবে বিষয়টি উপদেষ্টা অবগত ছিলেন না বলে সে সময় জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছিলেন নৌ উপদেষ্টার একান্ত সচিব (সরকারের উপসচিব) মো. জাহিদুল ইসলাম।
পরিকল্পনাহীন নতুন টার্মিনালের জমি নিলামে যত অনিয়ম
বন্দরের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কিংবা কোনো আলোচনায় ছিল না। তবুও নতুন আরেকটি টার্মিনাল নির্মাণে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ বছরের জন্য ১০ দশমিক ৬৬ একর জমি ইজারা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৬৬ একর জমি ইজারা দেওয়া হয়েছে কোনোপ্রকার টেন্ডার ছাড়াই। প্রথম দুই বছর দেওয়া হয়েছে গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে রেয়াতি সুবিধা। জায়গাটি ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে বন্দরের সম্ভাব্য সংকটকেও আমলে নেওয়া হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে জাগো নিউজে প্রতিবেদন প্রকাশের পর টেন্ডারবিহীন ৩ দশমিক ৬৬ একর জমির ইজারা বাতিলের কথা জানায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। পরে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ৭ একর জমি ইজারা নিয়ে ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকস লিমিটেডের মূল প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপের সঙ্গে গত ২০ এপ্রিল চুক্তিবদ্ধ হয় বন্দর।
টার্মিনাল নির্মাণের জন্য লালদিয়া চরের ৭ একর জমি ইজারার জন্য টেন্ডার ডেকে পরে আরও ৩ দশমিক ৬৬ একর জমি বিনা টেন্ডারে ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকস নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির টার্মিনাল অপারেশনের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাই আমি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।-ভারটেক্স অফডক লজিস্টিকস সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান ফাহিম নুর
এরপর ওই ইজারা প্রক্রিয়ায় নিয়ম মানা হয়নি এবং চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপের টার্মিনাল পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই দাবি করে উচ্চ আদালতে রিট করেন ওই ইজারা টেন্ডারে অংশ নেওয়া ভারটেক্স অফডক লজিস্টিকস সার্ভিস লিমিটেড। গত ১১ মে হাইকোর্টের বিচারপতি ফাতিমা নাজিব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের দ্বৈত বেঞ্চ নৌপরিবহন সচিব ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ আট বিবাদীকে দুই সপ্তাহের রুল জারি করেন।
এ ব্যাপারে ভারটেক্স অফডক লজিস্টিকস সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান ফাহিম নুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘টার্মিনাল নির্মাণের জন্য লালদিয়া চরের ৭ একর জমি ইজারার জন্য টেন্ডার ডেকে পরে আরও ৩ দশমিক ৬৬ একর জমি বিনা টেন্ডারে ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকস নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির টার্মিনাল অপারেশনের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাই আমি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।’
এ বিষয়ে জানতে ট্রান্সমেরিন লজিস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ ইকবাল আলী শিমুলের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তারও সাড়া দেননি।
জেলা প্রশাসনের মামলার জমি সিটি করপোরেশনকে ভাড়া
কর্ণফুলী পাড়ের ফিরিঙ্গি বাজার মৌজার আর এস ৬০১ দাগে বন্দরের ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের দুটি ‘এ’ ও ‘বি’ নামে দুটি ব্লকে ছয় দশমিক দুই চার একর জায়গার মালিকানা নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বন্দরের বিরোধ রয়েছে। খাস খতিয়ানভুক্ত জায়গাটি নিয়ে আদালতে জেলা প্রশাসনের মামলাও রয়েছে। ওই মামলা আদালতে চলমান থাকা অবস্থায় জায়গাটি কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়াই সিটি করপোরেশনকে এক বছরের জন্য প্রতি বর্গফুট ৩২ টাকা হারে অস্থায়ী ভাড়া দেয় বন্দর।
বন্দর ইয়ার্ডের খালি কনটেইনার পরিবহনের কাজটি আমার প্রতিষ্ঠান করে। নানান জটিলতার কারণে বন্দর এ কাজটির জন্য টেন্ডার করতে পারেনি। এখন টেন্ডার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সামনে টেন্ডার হবে।-এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম
বরাদ্দ পেয়ে জায়গাটি তৃতীয়পক্ষকে ২০ বছরের জন্য ইজারা দিতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বিজ্ঞপ্তি দেয় সিটি করপোরেশন। এ নিয়ে জাগো নিউজে সংবাদ প্রকাশ হলে ইজারা বাতিল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে ইজারা বাতিল করলেও সিটি করপোরেশনের জমা করা ভাড়া ফেরত নিয়ে দুই পক্ষের চিঠি চালাচালি চলছে।
টেন্ডার ছাড়াই চলছে বন্দরের খালি কনটেইনার পরিবহন
চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিপণ্য নিয়ে আসা অনেক খালি কনটেইনার একটি ইয়ার্ডে রাখতে হয়। বন্দরের ১২টি জেনারেল বার্থের (জিসিবি) খালি কনটেইনারগুলো নিয়ে যেতে হয় একটি ইয়ার্ডে। খালি এই কনটেইনার পরিবহনের কাজটি বর্তমানে এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে বিনা টেন্ডারে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বন্দরের বার্থ অপারেটর ফজলী সন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে ইকরাম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘জিসিবিতে খালি কনটেইনারগুলো রিমুভের ক্ষেত্রে টেন্ডার হয় না। ডিপিএম-এ (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) খালি কনটেইনার পরিবহনের কাজ করে এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ। বন্দর কীভাবে এ কাজটি দিচ্ছে সেটা বন্দর কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।’
চট্টগ্রাম বন্দর
এ বিষয়ে কথা হলে এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বন্দর ইয়ার্ডের খালি কনটেইনার পরিবহনের কাজটি আমার প্রতিষ্ঠান করে। নানান জটিলতার কারণে বন্দর এ কাজটির জন্য টেন্ডার করতে পারেনি। এখন টেন্ডার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সামনে টেন্ডার হবে।’ মাসে ১০ হাজারের মতো কনটেইনার তিনি পরিবহন করে বলে দাবি করলেও বাস্তবে এ সংখ্যা দ্বিগুণের চেয়েও বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ ক্রয়, বেশি দামে জাহাজ কেনা, অতিরিক্ত দামে তেল পরিবহনসহ একাধিক প্রকল্প চুক্তি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মসহ নানান অভিযোগে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে বেনামে জমা হওয়া একটি অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে তদন্তকারী সংস্থাটি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ একাধিক সংস্থার কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে তারা।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার সময় দুই হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত কেনা হয় চারটি। এতে প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকার আর্থিক অসঙ্গতি ও অপরিশোধিত তেল পরিবহন চুক্তি সম্পাদন করেন, যেখানে বাজারমূল্যের চেয়ে প্রতি মেট্রিক টনে অতিরিক্ত ৩০-৪০ মার্কিন ডলার পরিশোধের অভিযোগ ওঠে।
অফডক সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্টগুলোর মাধ্যমে খালি কনটেইনার আনা-নেওয়া করে। তবে বন্দরের ইয়ার্ডে কীভাবে পরিবহন হয় সে বিষয়ে জানা নেই।-বন্দরের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাসির উদ্দিন
২০২৪ সালের ১২ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান এস এম মনিরুজ্জামান। এর আগে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ও ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের (ডিইডব্লিউ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
দৈনিক গড়ে ৭-৮ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয় বন্দরে
সবশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে বন্দরের মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ০৬৯ টিইইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের সমমান কনটেইনার) হ্যান্ডলিং করেছে বন্দর। পাশাপাশি একই বছর ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ টন কার্গো হ্যান্ডলিং করা হয়।
যা বলছে বন্দর কর্তৃপক্ষ
বিনা টেন্ডারে খালি কনটেইনার পরিবহনের বিষয়ে তেমন সদুত্তর দিতে পারেননি বন্দরের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাসির উদ্দিন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘অফডক সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্টগুলোর মাধ্যমে খালি কনটেইনার আনা-নেওয়া করে। তবে বন্দরের ইয়ার্ডে কীভাবে পরিবহন হয় সে বিষয়ে জানা নেই।’ আর টার্মিনাল নির্মাণে জায়গা ইজারায় অনিয়মের বিষয়ে রিট হওয়া নিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানেন না বলে জানান।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে এর আগে বন্দরের অনুষ্ঠানে ভূমি ব্যবস্থাপনার অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো জবাব দেননি। সে সময় গণমাধ্যমের রিপোর্ট ‘অতিরঞ্জিত’ বলে দাবি করেন।
তবে বন্দর পরিদর্শনকালে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে শুধু ভূমি ব্যবস্থাপনা নয়, যে কোনো অনিয়মে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’