Image description

দেশে শিশুদের জন্য পরিচালিত জাতীয় ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন প্রায় ১৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের সংকটের কারণে গত বছরের মার্চের পর আর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি এই কর্মসূচির। গত বছর মার্চের পর সেপ্টেম্বর এবং এই বছরের মার্চে দুটি ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ক্যাপসুল সংকটে ওই সময়ের পরে আর তা করা হয়নি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত  গত মাসে গণমাধ্যমকে ইউনিসেফের কাছ থেকে ১০ই জুনের মধ্যে এক কোটির বেশি ভিটামিন - এ ক্যাপসুল পাওয়ার কথা জানালেও তা পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী ১০ জুনের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘এই ক্যাম্পেইন বন্ধ রয়েছে এটা বলা যাবে না। এটার জন্য চেষ্টা-তদবির চলছে। কিন্তু ক্যাপসুল পাইতে একটু দেরি হইতেছে। এইজন্য একটু দেরি হইছে জিনিসটা। ক্যাপসুল প্রাপ্তি সাপেক্ষে শিশুদের ভিটামিন - এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর এই ক্যাম্পেইনের সম্ভাব্য সময় জুনের শেষ সপ্তাহে নির্ধারণ করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ ১৫ই জুনের মধ্যে ক্যাপসুলটা আমাদের দেশে আইসা পৌঁছাবে। ক্যাপসুল বিদেশ থেকে ও বিমানে করে আসবে এবং ১৫ই জুন আসার কথা মাথায় রেখে জুনের শেষে কর্মসূচি শুরুর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ২৭শে জুনের মধ্যে আমরা ইনশাআল্লাহ এটা করবো বলে মোটামুটি প্রস্তুতি নিচ্ছি ।

এ বিষয়ে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, ‘এই ক্যাম্পেইন ব্যাহত হলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, দৃষ্টি সক্ষমতা, পুষ্টির ওপর প্রভাব পড়তে পারে।’

জনস্বাস্থ্যবিদ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘রাতকানা রোগটা কিন্তু নাই, নির্মূল হয়ে গেছে। ইপিআই টিকা দেওয়ার সাথে সাথে এটা দেওয়াতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে। এখন এটা না দিলে এসব রোগ রাতকানা, অপুষ্টি, হাম সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

প্রতি বছর এই কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের ভিটামিন - এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। এদের মধ্যে ছয় মাস থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের নীল রংয়ের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। এছাড়া, এক বছর বা ১২ মাস বয়স থেকে পাঁচ বছর বা ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের খাওয়ানো হয় লাল রংয়ের ক্যাপসুল। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে দুই কোটি ৫৫ লাখ শিশুকে এই ক্যাম্পেইনের আওতায় ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়।

এবিষয়ে ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, ‘আমরা দুই কোটি ৬০ লাখের (ভিটামিন- এ ক্যাপসুল) টার্গেট রাখি। ইউনিসেফের কাছে এই দুই কোটি ৬০ লাখই চাওয়া হয়েছে।’

ভিটামিন-এ নেই কেন, সংকট কোথায়?

ইউনিসেফের কাছ থেকে এবারই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এই ভিটামিন ক্যাপসুলটি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির সাথে বাংলাদেশের একটি চুক্তি হওয়ার কথা জানিয়ে ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে এবারই ইউনিসেফ থেকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারণ হলো, এক রাউন্ডের ক্যাপসুল যদি ওনাদের কাছ থেকে কেনা হয়, আরেক রাউন্ডের ক্যাপসুল ওনারা আমাদের বিনামূল্যে দিবে। এ জন্য মন্ত্রণালয় ইউনিসেফ থেকেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এর আগে অপারেশনাল প্ল্যানের মাধ্যমে টেন্ডার করে এই ভিটামিন-এ ক্যাপসুল কেনা হতো।’

২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্য খাতের সর্বশেষ অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপি শেষ হয়। এরপরেও টেন্ডার বা দরপত্রের মাধ্যমে এই ক্যাপসুল কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু পরে সেটি বাতিল হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, ‘আগে টেন্ডার হয়েছিল, কোনো কারণে মন্ত্রণালয় ওই টেন্ডারের সাথে দ্বিমত পোষণ করায় উনারা পরে ইউনিসেফ ফ্রি ফাইন্যান্সিং পদ্ধতিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

শিশুদের ভিটামিন-এ খাওয়ানো কেন জরুরি?

ভিটামিন-এ, ভিটামিন-ডি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-১২, জিংক, আয়রন এবং আয়োডিন- এই উপাদানগুলোকে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুপুষ্টিকণা বলা হয়। এ অনুপুষ্টিকণা মানুষের খুব কম পরিমাণে প্রয়োজন হয়। কিন্তু এটির সামান্য ঘাটতিতে একজন ব্যক্তিকে অনেক বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

এই অনুপুষ্টিকণা নিয়ে বাংলাদেশে ২০১১-১২ সালে প্রথম একটি জাতীয় জরিপ করা হয়েছিল। পরে ২০১৯ - ২০ সালে আরেকটি জরিপ করা হয়, যেটির ফল প্রকাশ হয়েছিল ২০২২ সালের অক্টোবরে। আইসিডিডিআরবি, জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ওই ফল প্রকাশের অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল।

দ্বিতীয় জাতীয় জরিপটিতে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শিশু ও নারীদের মধ্যে অনুপুষ্টিকণার ঘাটতি অনেক। ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের দুইজনের একজন ভিটামিন-এ'র ঘাটতিতে ভুগছে। ভিটামিন-এ ছাড়াও, শিশু ও নারীদের মধ্যে জিংক ও আয়রনের ঘাটতি রয়েছে। 

সেসময় জাতীয় জরিপের প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বি-র অসংক্রামক রোগবিষয়ক শাখার বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘প্রতি ১৩ জনের মধ্যে একজন নারীর দেহে এই ভিটামিনের ঘাটতি রয়েছে।’

এর আগে, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইউনিসেফ বলেছিল, ‘ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইনের আওতায় দুই কোটি আট লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য বিজয়।’

মহামারি কোভিডের সময়ও এই ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ শতাংশ পূরণ হয়েছে বলে ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, ‘শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে এবং সংক্রমণের প্রতি সংবেদনশীলতা কমাতে ভিটামিন এ গুরুত্বপূর্ণ।’

জনস্বাস্থ্যবিদ  ড. মুশতাক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রাতকানা দূর করার জন্যই ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছিল, পরে তা নির্মূলও হয়। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় হামে মৃত্যু বড় আকার ধারণ করেছে। একেতো হামের টিকা ছিল না। তার ওপর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যে ভিটামিন-এ, সেটাও ছিল না। ফলে যাদের হাম হয়েছে তাদের সেরে উঠতে দেরি হয়েছে বা অনেকে সেরে উঠতে পারেনি। নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।’

উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালে রাতকানা রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম গ্রহণ করে শিশুদের ভিটামিন 'এ' ক্যাপসুল খাওয়ানো শুরু হয়।

ভিটামিন এ ক্যাপসুলের উপকারিতা কী?

শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সঠিক বিকাশে সহায়ক ভূমিকার জন্য ভিটামিন- এ ক্যাপসুল খাওয়ানো জরুরি বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা। ভিটামিন-এ ক্যাপসুল শিশুর দেহে দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতে সহায়তা করে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং এতে শিশু বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকে, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং সঠিক ওজন বজায় রাখতে সহায়তা করে, ডায়রিয়া ও হামসহ অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়, শিশুর ত্বক সুরক্ষা নিশ্চিত করে, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়তা করে।

ভিটামিন-এ খাওয়ানোর পাশাপাশি কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানোর প্রতিও গুরুত্বারোপ করে ড. মুশতাক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ভিটামিন-এ এর সাথে আরেকটাও ছিল, সেটা হচ্ছে কৃমিনাশক খাওয়ানো। বাচ্চাদের পুষ্টি কৃমি খেয়ে ফেললে এটাও অপুষ্টির একটা কারণ হতে পারে। তাই ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি কৃমিনাশক ওষুধও খাওয়াতে হবে।’ খবর: বিবিসি বাংলা।