Image description

বাজেট ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আগ্রহ থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে। বাজেট বিশ্লেষণ নিয়ে তাদের মাথাব্যথা না থাকলেও কোন পণ্যের দাম কমবে বা কোনটির দাম বাড়বে, সেটি থাকে তাদের চিন্তায়-আলাপে। বাজেট প্রস্তাবে কোনো পণ্যে কর বা শুল্ক কমানো হলে স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতারা আশা করেন বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর শুল্ক বাড়লে চিন্তায় থাকেন ওই পণ্যের জন্য নিজের বাজেটের কতটুকু কাটছাঁট করতে হবে, তা নিয়ে।

গত বৃহস্পতিবার ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষিপণ্য, শিশুখাদ্য, ভোজ্য তেল ও খেজুরের দাম কমার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। অন্যদিকে বাইসাইকেল, সিগারেট, আমদানি করা ফল, চকলেটের দাম বাড়তে পারে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।

কিন্তু গতকাল শুক্রবার বাজার ঘুরে দেখা গেছে মিশ্রচিত্র। সাধারণ অর্থবছরের শুরু— অর্থাৎ জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকে বাজেট কার্যকর হলেও যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে ঘোষণা আছে, সেগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে অনেক পণ্যেরই। এমনকি দাম বাড়তে পারে, এমন কিছু পণ্যের সরবরাহই বন্ধের দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। বিপরীতে যেসব পণ্যের দাম কমার কথা, এর কোনোটিরই কমেনি। ক্রেতা-বিক্রেতাদের আশঙ্কা, সেটি হয়তো জুলাই মাসে গিয়েও কমবে না। তাদের অনেকের ভাষ্য, দাম কমার বিষয়টি কাগজে থাকলেও বাজারে দেখা যায় না সচরাচর।

কার্যকরের আগেই চড়া বাজারবরাবরের মতোই সরকারি ঘোষণার আগেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে তামাকজাত পণ্যের বাজারে। প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসার পরপরই সক্রিয় হয়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে কোম্পানি ও পাইকারি পর্যায় থেকে সিগারেটের জোগান একপ্রকার কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় বন্ধ হয়ে গেছে পণ্যটির সরবরাহই। ফলে খুচরা বাজারে প্রতিটি ব্র্যান্ডের সিগারেট বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে।

সাধারণত বাজেটে কোনো পণ্যের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত থাকলেই তা মুহূর্তের মধ্যে বাজারে কার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু এবারের বাজেটে যেসব পণ্যের শুল্ক বা কর ছাড়ের মাধ্যমে দাম কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, বাজারে সেগুলোর কোনো ইতিবাচক প্রভাব নেই।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কমার তালিকায় থাকা পণ্যগুলোর দাম আগের মতোই রয়েছে। বিক্রেতাদের অজুহাত, ‘আগের চড়া দামের স্টক শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাম কমানো সম্ভব নয়’।

অথচ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই ব্যবসায়ীরাই পুরনো স্টক থাকা সত্ত্বেও মুহূর্তের মধ্যে নতুন ও বাড়তি দাম কার্যকর করে দেন।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট ঘোষণার পর থেকে কার্যকর হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রতি বছরই নেন এমন অনৈতিক সুবিধা। এ সময় সরকারি নজরদারি না থাকায় বাড়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি।

সাইকেলের বিক্রিই বন্ধ: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরে যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে বাজেটে ইঙ্গিত মিলেছে, এর মধ্যে সাইকেল একটি। গতকাল পুরান ঢাকার বংশাল সাইকেল মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, দাম বাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে আরও এক মাস আগেই। সেই সঙ্গে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে নতুন এক সংকট। কিছু কোম্পানি সাইকেল সরবরাহই বন্ধ করে দিয়েছে।

গতকাল ছুটির দিনে স্ত্রী আর ছেলেকে নিয়ে লক্ষ্মীবাজার থেকে বংশালে এসেছিলেন রায়হান শেখ। ছেলের জন্য সাইকেল কেনার ইচ্ছা ছিল দীর্ঘদিনের। তিনি বললেন, ‘ছেলেটা অনেক দিন ধরেই সাইকেল কিনতে চাইছিল। বলেছিলাম এই মাসে বেতন পেলেই কিনে দেব। তাই চলে এলাম।’

তবে দোকানে গিয়েই কাঙ্ক্ষিত দামে সাইকেল পাননি রায়হান। কয়েক দোকান ঘুরে দেখলেন তার ধারণার চেয়ে দাম বেড়েছে অনেকটাই। বিক্রেতারা বলছেন, বাজেট উত্থাপনের কারণে দাম বেড়েছে।

অথচ রায়হান জানালেন, তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, মাসখানেক আগে থেকেই কিছুটা বেড়েছিল সাইকেলের দাম। এখন বাজেট ঘোষণার পর আবার বাড়ানোর পাঁয়তারা করছেন ব্যবসায়ীরা। রায়হান শেখের প্রশ্ন— তাহলে কি এক বাজেটকে কেন্দ্র করে দুই দফায় বাড়বে একই পণ্যের দাম?

এদিকে বংশালে ছয় বছর ধরে সাইকেলের ব্যবসা করা রিচ সাইকেল শপের মালিক মোহাম্মদ শাহিন জানালেন আরও উদ্বেগজনক তথ্য। বাজেট উত্থাপনের পরদিনই আগামীর সময়ের প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। তিনি জানালেন, সাইকেলের ফ্রিহুইলের দাম বাড়বে— এমন ঘোষণার পরই বিদেশি কোম্পানিগুলো বন্ধ করে দিয়েছে সাইকেল সরবরাহ।

তিনি জানালেন, কবে থেকে আবার সরবরাহ শুরু হবে এবং কত বাড়তি দামে সাইকেল কিনতে হবে— এই প্রশ্নের উত্তর এখন সরবরাহকারীদের কাছেই।

শাহিন অবশ্য জানালেন, আমদানিকারকদের কাছে এই চিত্র নতুন কিছু নয়। তারা আগেও এমন পরিস্থিতি দেখেছেন একাধিকবার।

প্রস্তাবিত বাজেটে সাইকেলের ফ্রিহুইল ও স্প্রকেট আমদানিতে কাস্টমস শুল্ক বর্তমান ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্কও যুক্ত হচ্ছে— অর্থাৎ মোট শুল্ক বাড়ছে ১৫ শতাংশ পয়েন্ট, যা আগের হারের প্রায় দ্বিগুণ।

কিন্তু শাহিনের হিসাব অনুযায়ী, ফ্রিহুইলের দাম মাত্র ১৫০-২০০ টাকা। এই যন্ত্রাংশে ১৫ শতাংশ পয়েন্ট শুল্ক বাড়লে দাম বাড়ার কথা বড়জোর ২০-৩০ টাকা। অথচ বংশাল বাজারে প্রতিটি সাইকেলের দাম এক মাসেই বেড়েছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।

কমার কথা, কমেনি: গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অনেকেই বলেছেন,‘ বাজেটে দাম কমার ঘোষণা এলেও বাজারে সেই প্রভাব দ্রুত দেখা যায় না।’ ওই বাজারের কৃষিপণ্য বিক্রেতা নাজমুল ইসলাম বলছিলেন, ‘কৃষিপণ্যের দাম মূলত নির্ভর করে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও ক্রেতার চাহিদার ওপর। বাজেটের কারণে দাম বাড়বে বা কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।’ তার ভাষ্য, কাঁচামালের দাম বাড়বে না কমবে, এটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। কোনো সবজির সরবরাহ কম থাকলে দাম বেড়ে যায়। আবার বাজারে ক্রেতা কম থাকলে দাম কমে যায়। আবহাওয়ারও প্রভাব আছে।

বাজেট ঘোষণায় শিশুখাদ্যের দাম কমার কথা থাকলেও কমেনি এখনো। অবশ্য সেটি ১ জুলাইয়ের আগে সম্ভাবনাও নেই। বিক্রেতারা বলছেন, তারা এখনো আগের দামে পণ্য কিনছেন এবং সেই দামেই বিক্রি করছেন।

শিশুখাদ্য বিক্রেতা মোহাম্মদ মাসুদ বললেন, ‘এখনো দাম বাড়েনি বা কমেনি। আমরা আগের রেটেই বিক্রি করছি। সংবাদে দেখেছি কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে। যদি কমে, তাহলে অবশ্যই কম দামে বিক্রি করব। নতুন দামে মাল বাজারে এলে তখন নতুন রেটে বিক্রি করা হবে।’

আরেক বিক্রেতা মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাজেট তো মাত্র হয়েছে। দাম বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। শুনেছি শিশুখাদ্যের দাম কমার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এখনো কোনো পরিবর্তন দেখিনি। আমরা কম দামে কিনতে পারলে ক্রেতাদেরও কম দামে দিতে পারব।’

একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে ভোজ্য তেলের বাজারেও। তেল ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেছেন, ‘দাম বাড়ছে না কমছে, সেটি এখনো জানি না। বাড়ার হিসাবও পাইনি, কমার হিসাবও পাইনি। ঈদের আগেই তেলের দাম বেড়েছিল। এরপর থেকে একই দাম চলছে। আমরা ডিস্ট্রিবিউটরের কাছ থেকে পণ্য কিনি। নতুন কোনো রেট এখনো আসেনি।’

খেজুর ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের কথায় ফুটে ওঠে ব্যবসায়ীদের আরেক বাস্তবতা। তিনি বললেন, ‘টিভিতে দেখি দাম কমার কথা বলা হয়। কিন্তু আমরা যখন বাজার থেকে কিনতে যাই, তখন তো কম দামে পাই না। দাম না কমলে আমরা কীভাবে কম দামে বিক্রি করব? এখন পর্যন্ত দাম বাড়েও নাই, কমেও নাই।’