অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন। নতুন অর্থবছরের জন্য তিনি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেন, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। নতুন এই বাজেটে বিভিন্ন তৈরি পণ্যে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। একইসঙ্গে পণ্যের কাঁচামালে কর কমানোসহ ব্যবসার ক্ষেত্রেও ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবংগ, গোলমরিচ, ধনিয়াসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সে হিসেবে এসব নিত্যপণ্যের দাম কমতে পারে। তবে কাঁচাবাজারে এখনও পড়েনি বাজেটের প্রভাব। বরং অন্যসময়ের মতো উচ্চমূল্যেই বিক্রি সব পণ্য। বিক্রেতারা বলছেন বাজারে এখনও পড়েনি বাজেটের প্রভাব, আর কাঁচা পণ্যের দাম সাধারণ বাজেটের ওপর নির্ভর করে বাড়ে না।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজার সরেজমিনে ঘুরে এই চিত্র দেখা যায়।
সবজির দাম এখনও বেশি
ঈদের সময়ে বেড়ে যাওয়া সবজির দাম এখনও সেভাবে কমেনি। কয়েকটি সবজির দাম কিছুটা কমলেও সেটা কম দাম বলা যাবে না। বেশিরভাগ সবজি বিক্রি হচ্ছে বেশি দামেই। আজ সবচেয়ে কম মূল্যের সবজির দাম ৫০ টাকা এবং সবচেয়ে বেশি মূল্যের সবজির দাম ২০০ টাকা।
আজকের বাজারে প্রতি কেজি দেশি টমেটো ১৪০-১৬০ টাকা, দেশি গাজর ১০০ -১২০ টাকা, চায়না গাজর ১৬০ টাকা, লম্বা বেগুন ৮০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ৮০ টাকা, কালো গোল বেগুন ৮০ টাকা, সজনে ১৮০-২০০ টাকা, দেশি শসা ১০০-১২০ টাকা, উচ্ছে ৮০ টাকা, করল্লা ১০০ টাকা, কাকরোল ৭০-৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৭০ টাকা, পটল (হাইব্রিড) ৬০-৭০ টাকা, দেশি পটল ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৭০-৮০ টাকা, ধুন্দল ৬০-৭০ টাকা, ঝিঙা ৭০-৮০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, কচুর লতি ৬০-৮০ টাকা, মূলা ৭০ টাকা, কচুরমুখী ১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা, ধনেপাতা (মানভেদে) ২০০ টাকা, শসা (হাইব্রিড) ৬০ টাকা, পেপে ৫০-৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর মানভেদে প্রতিটি লাউ ৭০-১২০ টাকা, চাল কুমড়া ৬০ টাকা, ফুলকপি ৮০ টাকা, বাধাকপি ৭০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি হালি কাঁচা কলা ৬০ টাকা। এছাড়া প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকা করে।
উল্লেখিত ৩২টি সবজির মধ্যে ৮০ থেকে ১০০ টাকা বা এর ওপরে দাম রয়েছে ২১টি সবজির। আর বাকি সবজিগুলোর দাম রয়েছে ৪০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে।
সবজির দাম নিয়ে বিক্রেতা শাহ আলম বলেন, সবজির দাম কমে গিয়েছে। বাজেটের প্রভাব এখানে পড়েনি।
এটা পচনশীল পণ্য, রেখে দিয়ে দাম বাড়ানোর উপায় নেই। যেগুলো রেখে বিক্রি করা যায় সেগুলোর দাম বাড়তে কমতে পারে। এভাবেই বলছিলেন আরেক সবজি বিক্রেতা মো. আনোয়ার।
স্বস্তির দামে স্থির রয়েছে আদা-রসুন-আলু-পেঁয়াজের দাম
আলু-পেঁয়াজ, আদা-রসুনের বাজার এখনো স্বস্তির দামে স্থির রয়েছে বলা যায়। এসব পণ্য রয়েছে সাধারণ মানুষের নাগালেই মধ্যেই রয়েছে বলা চলে।
আজ আকার ও মানভেদে ক্রস জাতের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায় ও দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজিতে। এছাড়া প্রতি কেজি লাল আলু ২৫ টাকা, সাদা আলু ২৫ টাকা, বগুড়ার আলু ৪০ টাকা, দেশি রসুন ৯০-১০০ টাকা, চায়না রসুন ১৩০-১৪০ টাকা, ভারতীয় আদা ১৬০ দরে বিক্রি হচ্ছে।
মুরগির দাম বাড়তি, ডিমের দাম অপরিবর্তিত
বয়লার মুরগি ছাড়া অন্যান্য মুরগির মাংস এখনো চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। ঈদের সময় বেড়ে যাওয়া এসব মুরগির দাম এখনো কমেনি। তবে ডিমের দাম কিছুটা কমে আগের দামেই অপরিবর্তিত রয়েছে।
আজকে বাজারে প্রতি কেজি বয়লার মুরগি ১৫০ -১৬৩ টাকা, কক মুরগি ৩৩০-৩৪৫ টাকা, লেয়ার মুরগি ৩৭০ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৮০০ টাকা ও খাসির মাংস ১২৫০ টাকা কেজি। আর প্রতি ডজন মুরগির লাল ডিম ১২০ টাকা এবং সাদা ডিম ১০৫-১১০ টাকা, হাঁসের ডিম ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
মুরগির বাজারে বাজেটের কোন প্রভাব পরেছে কিনা জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চিকেন হাউজের বিক্রেতা মো. সুলতান বলেন, বাজেটের প্রভাব এখনও পড়েনি। হয়তো প্রভাব পড়তে পারে।
আনোয়ার ডিমের আড়তের বিক্রেতা বলেন, বাজেটের কোনও কিছু এখনও আসেনি বাজারে। কিন্তু অন্য জিনিসের দাম যখন বাড়বে তখন অটো ডিমের দাম বেড়ে যাবে। দাম না বাড়লেই ভালো। আমাদের বেচাকিনি ভালো হয়, আবার চালানও কম লাগে।
আরেক বিক্রেতা সহিদ ডিম ঘরের সামিউল ইসলাম বলেন, বাজেটের সঙ্গে ডিমের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা চাহিদার ওপর নির্ভর করে। চাহিদা বেশি থাকলে দাম বাড়ে, আর চাহিদা কম থাকলে দাম কমে যায়।
এছাড়া আজকের বাজারে আকার ও ওজন অনুযায়ী ইলিশ ১৮০০-৩৫০০ টাকা, রুই মাছ ৪০০-৭০০ টাকা, কাতল মাছ ৪০০- ৬৫০ টাকা, কালিবাউশ ৫০০-৮০০ টাকা, চিংড়ি মাছ ১০০০-১৭০০ টাকা, কাঁচকি মাছ ৫০০ টাকা, কৈ মাছ ২৬০ টাকা, পাবদা মাছ ৪০০-৬০০ টাকা, বাসাতি মাছ ১৪০০-১৫০০ টাকা, কাজলি মাছ ১৮০০-২০০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০-১২০০ টাকা, টেংরা মাছ ৬০০-৭০০ টাকা, বেলে মাছ ১০০০-১২০০ টাকা, বোয়াল মাছ ৫০০-১০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
দামের পরিবর্তন নেই মুদি দোকানের পণ্যেও
নতুন বাজেটে লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে এসব পণ্যের দাম কমবে। তবে কেবল গতকাল বাজেট ঘোষণা হওয়ার এখনও বাজারে আসেনি এর প্রভাব। সব পণ্য বিক্রি হচ্ছে আগের দামেই।
আজ প্রতি কেজি প্যাকেট পোলাওয়ের চাল ১৯০ টাকা, খোলা পোলাওয়ের চাল মান ভেদে ১৬০, ছোট মুসরের ডাল ১৫০, মোটা মুসরের ডাল ৯০, বড় মুগ ডাল ১৪০, ছোট মুগ ডাল ১৭০, খেশারি ডাল ১০০, বুটের ডাল ১১০, ছোলা ৮০-৯৫, মাশকালাইয়ের ডাল ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
আর প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৯০ টাকা, কৌটাজাত ঘি ১৪২ -১৫৫০ টাকা, খোলা ঘি ১৪০০ টাকা, প্যাকেটজাত চিনি ১১০ টাকা, খোলা চিনি ১০৫ টাকা, দুই কেজি প্যাকেট ময়দা ১৪৫ টাকা, আটা দুই কেজির প্যাকেট ১৩০ টাকা, খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এছাড়া এলাচি ৫২০০ টাকা, দারুচিনি ৫৬০ টাকা, লবঙ্গ ১৪৫০ টাকা, সাদা গোল মরিচ ১৩৫০ টাকা ও কালো গোল মরিচ ১২৮০ টাকা, কাজু বাদাম ১৫৫০ টাকা, কাঠ বাদাম ১৩৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
নিউ সনিয়া জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা নয়ন মাঝি বলেন, ‘‘এখনও বাজেট বাজারে আসেনি। শুনেছি কিছু মসলার দাম নাকি কমেছে। এখন নতুন মাল না আসা পর্যন্ত বুঝতে পারছি না কতটুকু কমেছে। এখন দেখা যাক কতটা দাম কমে।’