একসময় দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতো ব্যাংক খাত। কিন্তু বছরের পর বছর অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, খেলাপি ঋণের বিস্তার ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সেই খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এবার সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যাংক পরিচালকদের জবাবদিহীতা, ঋণ বিতরণ, খেলাপি হ্রাস এবং ঋণ পুন: তফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ব্যাংক পরিচালনায় পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়েও।
অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক নিয়োগ ও হস্তক্ষেপ এরই মধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত করতে সংশোধন করা হয়েছে প্রয়োজনীয় আইন। দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃমূলধনীকরণ ও ব্যবস্থাপনা সংস্কার কার্যক্রমও বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণের জন্য চলতি অর্থবছরে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে।
তিনি আরও জানান, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে ব্যাংক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার।
ব্যাংক খাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্য, এর মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে নারী, তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে একটি আধুনিক, শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার খাতে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাজেট বক্তব্যে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা ঋণনির্ভর বিনিয়োগকে ইক্যুইটিতে রূপান্তর করছি। আমাদের লক্ষ্য বর্তমান ঋণভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগ ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা।’
তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের জন্য বন্ড মার্কেট ও বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে, যাতে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের চাপ কমে। করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুকসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উপকরণের উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর কাঠামো প্রণয়ন করা হবে।
দেশের ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট ও অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ এবং সেগুলোর অর্থায়নে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘আমরা বর্তমান মধ্যমমানের ঝুঁকি থেকে নিম্ন ঝুঁকির ঋণমানে ফিরে আসতে চাই। তাই রাজস্ব বৃদ্ধি করে বাজেট ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রেখে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাই।’
তিনি বলেছেন, অতীতে ব্যাপক ঋণ গ্রহণের কারণে ঋণ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার ফলে বাজেট ঘাটতিও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার ঋণ ব্যবস্থাপনা সংস্কার, উচ্চ রিটার্নসমৃদ্ধ খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামোর আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অর্থপ্রবাহ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।