আসামের গোয়ালপাড়া জেলায় এক মুসলিম নারীকে গ্রেপ্তার এবং তাঁর নাবালক ছেলেকে আটক করেছে পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে, ওই স্কুলছাত্র টিফিনে গোমাংস নিয়ে এসেছিল এবং তার দুই হিন্দু সহপাঠীকে তা খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিল। সাম্প্রদায়িক দিক থেকে স্পর্শকাতর এই জেলার কৃষ্ণাই শহরের একটি সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে, যা ঘিরে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া নারীর নাম নূর শাহিদা বেগম। অভিযোগ রয়েছে, তিনিই তাঁর ছেলের জন্য ওই খাবার তৈরি করে দিয়েছিলেন। মা ও ছেলে—উভয়ের বিরুদ্ধেই ভারতীয় ন্যায় সংহিতা-র অধীনে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, অন্যায়ভাবে পথরোধ করা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষমূলক কাজ এবং দলবদ্ধভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ধারায় মামলা করা হয়েছে।
দুই হিন্দু শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর এই মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার ঘটনাটি ঘটে যখন নবম শ্রেণীর এক ছাত্র টিফিন বক্সে করে গোমাংসের বিরিয়ানি নিয়ে আসে। কর্মকর্তারা জানান, সে সময় সেখানে আরও চারজন মুসলিম ছাত্র উপস্থিত ছিল এবং তারা হিন্দু সহপাঠীদের সেই খাবার দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ।
অভিযুক্ত নাবালক ছাত্রটিকে কিশোর আদালতে হাজির করা হয়েছে, অন্যদিকে বাকি চার ছাত্রকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে।
একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঘটনাটি স্কুলের বাইরে জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় কিছু সংগঠন এতে যুক্ত হয়, যার ফলে বিষয়টি আরও বড় আকার ধারণ করে এবং এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
তবে পুলিশ কর্তৃক জিজ্ঞাসাবাদকৃত চার ছাত্রের মধ্যে একজনের বাবা জোর করে গোমাংস খাওয়ানোর এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, যে ছাত্রটি টিফিন এনেছিল, সে তার অন্য মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে বিরিয়ানি ভাগ করে খাচ্ছিল। এমন সময় দুই হিন্দু ছাত্র সেখানে এসে জানতে চায় তারা কী খাচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, "সে শুধু বিরিয়ানির ভাতটুকু অফার করেছিল, মাংস নয়।" হিন্দু ছাত্ররা তা খেতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বিষয়টি শিক্ষকদের অবহিত করে।
অভিভাবকটি আরও অভিযোগ করেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রথমে বিষয়টি নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বাড়িতে জানানোর পর স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এতে হস্তক্ষেপ করায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত পাঁচ মুসলিম শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে।
স্কুল ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট কমিটির সদস্যরা এই শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বহিষ্কারের একটি প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠকে বসবেন বলে জানা গেছে।
কমিটির সভাপতি সুব্রত দাস জানান, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় শিক্ষক এবং অধ্যক্ষ প্রথমে স্কুলের ভেতরেই এটি সমাধান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় সংগঠনগুলো জড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
পরবর্তীতে গোয়ালপাড়ার জেলা প্রশাসক এবং সিনিয়র পুলিশ সুপার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে স্কুলটি পরিদর্শন করেন।
এই বিতর্কের পর স্কুল প্রশাসন শিক্ষার্থীদের টিফিন বক্সে কেবল নিরামিষ খাবার আনার নির্দেশ জারি করেছে। জেলা প্রশাসক প্রদীপ তিমুং জানান, তিনি শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন শিক্ষার্থীরা টিফিনে "সর্বোচ্চ ডিম" আনতে পারে। স্কুলে টিফিনে মাছ বা মাংস আনার অনুমতি দেওয়া হবে না।
এদিকে, স্থানীয় কিছু সম্প্রদায়ের নেতা শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে স্থানীয় ছাত্রনেতা মনিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘বিষয়টি যা-ই হোক না কেন, এর জন্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। আমাদের এই এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যেখানে আমরা সবাই প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করি।’’
শীর্ষনিউজ/