রেহান আসিফ আসাদ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি পেশাদার। আসন্ন বাজেটে সিম ট্যাক্স, টেলিকম খাতের করভার, স্টার্টআপ তহবিল, প্রযুক্তি উৎপাদন শিল্প, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
ঢাকা স্ট্রিম: এবারের বাজেট নিয়ে আপনাদের সামগ্রিক ভাবনা কী রকম?
রেহান আসিফ আসাদ: এবারের বাজেটের অন্যতম একটা থিম হলো এটা হবে সাধারণ জনগণ কনজিউমার ফোকাসড। দ্বিতীয়ত, এটা হবে সার্ভিস প্রোভাইডার ফোকাসড। আর তৃতীয় ফোকাস থাকবে ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারার ও স্টার্টআপ, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং পুরা ফ্রিল্যান্সার কমিউনিটি। তাই পুরা বাজেট এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে নির্বাচনি ইশতেহারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার সম্পূর্ণ প্রতিফলন এই বাজেটে থাকে। বাজেটের আগে আমরা সাধারণ জনগণ এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির যারা প্রতিনিধি তাদের সঙ্গে বসা হয়েছে। স্টার্টআপ কমিউনিটির সাথে বসেছি। যারা ম্যানুফ্যাকচার মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার, কম্পিউটার ম্যানুফ্যাকচারার তাদের সাথে বসেছি। এরকম ধারাবাহিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
এটা একটা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার। সেই বিবেচনাতেই আমরা দেশের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করবার চেষ্টা করেছি। যাতে জনসাধারণের মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধান করা যায় এই বাজেটের মাধ্যমে। আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে—বিশেষ করে জিএসএমএ সম্মেলন কিংবা আইটিইউ-এর বিভিন্ন আলোচনায়—বাংলাদেশকে প্রায়ই এমন একটি দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হতো, যেখানে এখনো সিম কার্ডের ওপর আলাদা কর আরোপ করা হয়। অথচ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ বহু বছর আগেই এ ধরনের কর ব্যবস্থা থেকে সরে এসেছে; এটি মূলত দুই দশক আগের একটি ধারণা।
আমরা শুরু থেকেই মনে করেছি, সাধারণ মানুষের জন্য মোবাইল সংযোগ আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাদের ওপর করের বোঝাও কমানো দরকার। সে কারণেই সিম ট্যাক্স নিয়ে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিতে যাচ্ছি।
আরেকটি বিষয় হলো, আপনারা যদি টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন এই খাতে করের বোঝা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থাৎ টেলিকম ও আইসিটি খাত এখনো উচ্চ করহারের চাপের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের ওপর মোট করের হার প্রায় ৫১ শতাংশ। আর ফিক্সড নেটওয়ার্ক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ। আমরা সামগ্রিকভাবে কর ব্যবস্থাপনায় কীভাবে তাদের সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেব। এর ফলে তারা গ্রাহকদের আরও উন্নত সেবা দিতে পারবে এবং পুরো খাতের জন্যই একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে।
তৃতীয় যে বিষয়টি আমরা লক্ষ্য করেছি, তা হলো আমাদের দেশে স্মার্টফোনের ব্যবহার এখনো ৫০ শতাংশের নিচে। অথচ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে—ভারত, পাকিস্তান, ভুটান কিংবা মালদ্বীপ—দেখা যায়, সেখানে ৪জি ব্যবহারের হার অনেক বেশি। আমরা বিশ্লেষণ করে দেখেছি, এর অন্যতম প্রধান বাধা হলো স্মার্টফোনের উচ্চ মূল্য।
এ কারণে আমরা স্থানীয় মোবাইল ফোন নির্মাতা এবং কম্পিউটার প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এই প্রক্রিয়ায় আমরা উপলব্ধি করেছি যে, যথাযথ নীতিগত সহায়তা দিতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক প্রযুক্তি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে যেভাবে তৈরি পোশাক শিল্প গড়ে উঠেছিল, এবং যেভাবে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড়সহ নানা ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতের জন্যও আমরা তেমন বা সমপর্যায়ের সহায়তা দিতে চাই।
আমরা এর মাধ্যমে দ্বিমুখী সুফল আশা করছি। প্রথমত, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে। ফলে এসব পণ্যের দাম কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ইলেকট্রনিকস রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারবে।
ঢাকা স্ট্রিম: কোরিয়া আশি-নব্বই দশকে তার ম্যানুফ্যাকচারদের জন্য করেছিল, যেটা এলজি এবং স্যামসাংয়ের মতো বড় জায়ান্ট কোম্পানি ডেভেলপ করছিল...
রেহান আসিফ আসাদ: আমাদের দেশে সম্প্রতি অনেক সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ গড়ে উঠেছে এবং আরও গড়ে উঠছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক কাঠামো, অর্থায়ন এবং বিশেষ করে করব্যবস্থা নিয়ে তাদের অনেক সমস্যা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনায় বসে আমি দেখেছি, টার্নওভার কর, ভ্যাট এবং অন্যান্য কর-সংক্রান্ত বাধা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, নব্বইয়ের দশকে দেশটি কীভাবে একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলেছিল। আজকের স্যামসাং, এলজি, হুন্দাই, কিয়া কিংবা ডেউ—এসব প্রতিষ্ঠান একসময় ছোট উদ্যোগ হিসেবেই যাত্রা শুরু করেছিল। পরে তারা বিশ্বমানের ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।
চীনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০০০ সালের পর সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে যে স্টার্টআপভিত্তিক উদ্ভাবন-পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছিল। আজকের চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানের পেছনে তার বড় ভূমিকা রয়েছে। ভারতের দিকেও তাকালে দেখা যায়, উইপ্রো, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস (টিসিএস) এবং আরও অনেক বড় প্রতিষ্ঠান একসময় ছোট উদ্যোগ হিসেবেই যাত্রা শুরু করেছিল।
কেউ সফটওয়্যার তৈরি করবে, কেউ হার্ডওয়্যার, আবার কেউ ভোক্তাপণ্য উদ্ভাবন করবে—এটাই একটি সুস্থ উদ্যোক্তা-পরিবেশের বৈশিষ্ট্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী উভয়েরই দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে, দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের যথাযথ নীতিগত সহায়তা, আর্থিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা দেওয়া গেলে তারা বাংলাদেশেই বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হবে—সেটি সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার বা অন্য যেকোনো প্রযুক্তি খাতেই হোক।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে আমরা একটি বড় কর্মসূচি ঘোষণা করতে যাচ্ছি। এর আওতায় প্রতি বছর ৫০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল গঠন করা হবে। পাশাপাশি, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী ১০ বছর আয়কর, ভ্যাট, নিয়ন্ত্রক শুল্ক (আরডি) এবং কাস্টমস ডিউটি—সব ধরনের কর থেকে অব্যাহতি পাবে।
একই ধরনের কর-সুবিধা ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্যও প্রযোজ্য হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
ঢাকা স্ট্রিম: এদেরকে বাছাই করার ক্ষেত্রে, এই সুযোগ সুবিধাটা যোগ্য লোক পাবে কিনা, এই মেকানিজমটার ব্যাপারে কি পরিকল্পনা?
রেহান আসিফ আসাদ: স্টার্টআপ বাংলাদেশ কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর এ নিয়ে বড় অভিযোগ ছিল যে অর্থায়ন বা সহায়তা অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনার ভিত্তিতে দেওয়া হয়। আমরা সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্টার্টআপ বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনর্গঠন করেছি। এর নেতৃত্বে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি নেই। বরং এখানে রয়েছেন স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পেশাজীবীরা—সফল উদ্যোক্তা, অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর এবং যারা দীর্ঘদিন ধরে স্টার্টআপ খাতের সঙ্গে কাজ করেছেন, বিনিয়োগ করেছেন ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
আমাদের মৌলিক বিশ্বাস হলো, স্টার্টআপ সহায়তা ব্যবস্থাকে চারটি স্তরে ভাগ করতে হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রাথমিক উদ্যোগ থেকে শুরু করে দ্রুত সম্প্রসারণশীল (স্কেল-আপ) ব্যবসা পর্যন্ত—প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা সহায়তা কাঠামো থাকবে। অর্থায়নের পরিসরও ছোট আকারের অনুদান বা বিনিয়োগ থেকে শুরু করে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবেন সেইসব পেশাজীবী, যারা নিজেরা স্টার্টআপ গড়েছেন, ব্যবসা পরিচালনা করেছেন কিংবা বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করেছেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।
যে কেউ একটি ভালো ধারণা, উদ্ভাবনী পণ্য বা শক্তিশালী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে আসতে পারবেন। তিনি তার প্রস্তাব উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন এবং তার মূল্যায়ন হবে সম্পূর্ণভাবে ধারণার গুণগত মান, পণ্যের সম্ভাবনা এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতার ভিত্তিতে। অন্য কোনো বিবেচনা এখানে প্রাধান্য পাবে না।
ঢাকা স্ট্রিম: এটা তো ইয়ুথ ফোকাস হবে? এই এইজ গ্রুপের ক্ষেত্রে কি ভাবা হয়েছে?
রেহান আসিফ আসাদ: যদিও এই উদ্যোগে তরুণদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তবু আমাদের মূল লক্ষ্য শুধু তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের প্রধান মনোযোগ উদ্যোক্তাদের ওপর—আর উদ্যোক্তার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই।
গত তিন মাসে আমি নানা ধরনের উদ্যোক্তার সঙ্গে দেখা করেছি। যেমন একজন মা ও তার মেয়ে মিলে জামদানি কাপড় ব্যবহার করে হস্তশিল্প পণ্য তৈরি করছেন। তারা অত্যন্ত মানসম্মত পণ্য তৈরি করছেন এবং সেগুলোকে বৈশ্বিক ই-কমার্স বাজারে নিয়ে যেতে চান। আবার এমন বয়স্ক উদ্যোক্তার সঙ্গেও আমার দেখা হয়েছে, যিনি কৃষি খাতের জন্য একটি অ্যাপ তৈরি করেছেন।
তাই হ্যাঁ, প্রযুক্তি খাতে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা আছেন, ফ্রিল্যান্সিং খাতেও অনেক তরুণ কাজ করছেন। কিন্তু আমাদের নীতির কেন্দ্রে রয়েছে ‘উদ্যোক্তা’—তার বয়স যাই হোক না কেন।
আমাদের লক্ষ্য হলো উদ্যোক্তাদের যথাযথ সহায়তা দেওয়া, যাতে তারা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেন। তারা যে নতুন ধারণা নিয়ে ভাবছেন, যে সৃজনশীল উদ্যোগ গড়ে তুলতে চান, আমরা সেই সৃজনশীলতাকে কীভাবে বিকশিত ও এগিয়ে নিতে পারি—সেটিই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ঢাকা স্ট্রিম: বিশেষ শিল্পাঞ্চল বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা তাদেরকে ডাটা সেন্টারের সুবিধা দেওয়া, এগুলোর ব্যাপারে কি কোনো প্ল্যান আছে আপনাদের?
রেহান আসিফ আসাদ: গত কয়েক বছরে দেশে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোও গড়ে উঠেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক রয়েছে, রাজশাহীতে হাইটেক পার্ক রয়েছে, যেখানে স্টারলিংক তাদের গ্রাউন্ড বেস স্টেশন স্থাপনের কাজ করছে। এছাড়া যশোরে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কও রয়েছে। তাই আমি মনে করি, অবকাঠামো এখন সবচেয়ে বড় বাধা নয়। অবশ্য উৎপাদনশিল্পের ক্ষেত্রে অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সফটওয়্যার খাতের জন্য এর গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে ভিন্ন।
বর্তমানে বিদ্যমান অবকাঠামোগুলো আমরা সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো, এসব স্থাপনা ও সুবিধাকে কীভাবে ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্পের জন্য আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে আমরা এটাও মূল্যায়ন করছি যে আগামী দিনের চাহিদা পূরণে নতুন কী ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ডেটা সেন্টারের বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসক্ষম ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার কাঠামো চালুর উদ্যোগ নিচ্ছি। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এআই-চালিত ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি’ এবং ‘ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ একই বৃহত্তর রূপান্তর পরিকল্পনার অংশ।
সামগ্রিকভাবে আমরা পুরো অবকাঠামো-ব্যবস্থাকে নতুন করে মূল্যায়ন করছি, যাতে ধাপে ধাপে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও ডিজিটাল অর্থনীতিভিত্তিক এই খাতকে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায়।
ঢাকা স্ট্রিম: আমাদের স্কেলটা কিরকম মানে আমাদের দেশের নিডের কথা চিন্তা করেই তো?
রেহান আসিফ আসাদ: আমাদের ক্ষেত্রে দেশের আকার ও চাহিদার ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কথা ভাবার আগে আমাদের নিজেদের প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে হবে। আমরা মনে করি, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের ডেটা সেন্টার খাতে একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তন ঘটবে। তবে শুধু ডেটা সেন্টার নির্মাণ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত ডেটাবেইস, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যভিত্তিক সেবার উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা—প্রতিটি খাতেই মানসম্মত তথ্যভান্ডার ও উন্নত ডেটা অবকাঠামোর মাধ্যমে সেবার মান এবং নাগরিক সুবিধা মৌলিকভাবে উন্নত হবে।
তবে প্রথম অগ্রাধিকার হলো দেশের নিজস্ব চাহিদা পূরণ করা। আমাদের নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সেবা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
এরপর দ্বিতীয় ধাপে আমরা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সম্ভাবনার দিকে তাকাতে চাই। উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। সেখানে বিশ্বমানের ডেটা সেন্টার রয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের স্থান ও সক্ষমতা ফুরিয়ে আসছে। এই বাস্তবতা নতুন সুযোগও তৈরি করছে।
যদি আমরা বিশ্বমানের ফাইবার নেটওয়ার্ক, সাবমেরিন কেবল সংযোগ এবং ডেটা অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারি, তাহলে শুধু দেশের চাহিদাই নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের চাহিদাও পূরণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারব। তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্বল্পমেয়াদি নয়। আমরা শুধু আগামী এক বা দুই বছরের কথা চিন্তা করছি না। আমরা তিন থেকে পাঁচ বছর এবং পাঁচ থেকে দশ বছরের পরিকল্পনা মাথায় রেখে এগোচ্ছি। প্রথমে দেশের প্রয়োজন মেটানো, নাগরিক সেবার মান উন্নত করা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোকে শক্তিশালী করা—এটাই লক্ষ্য। এরপর বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামো কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দিকে আমরা এগোতে চাই।
ঢাকা স্ট্রিম: স্যাটেলাইটের ব্যাপারে কোনো কিছু থাকছে বাজেটে? এই বিষয়টার ব্যাপারে কোনো রিভিউ হচ্ছে কিনা, নতুন কিছু আসছে কিনা?
রেহান আসিফ আসাদ: স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে আমরা স্টারলিংকের সঙ্গে কাজ করছি। স্টারলিংকের বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্রডব্যান্ড সক্ষমতা ও সাপোর্ট রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্টারলিংকের কার্যক্রম চালু হয়েছে এবং তারা এখন সেবা দিচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে স্টারলিংক ব্যবহার করে আন্তঃনগর ট্রেনে ইন্টারনেট সুবিধা দিচ্ছি। আমরা ইতোমধ্যে সাতটি রেলস্টেশনে ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট সুবিধা চালু করেছি। তবে আমরা স্যাটেলাইট, ব্রডব্যান্ড বা অন্য কোনো প্রযুক্তিকে আলাদাভাবে দেখি না।
আমরা বলেছিলাম, ১০০ দিনের মধ্যে দেশের সব বিমানবন্দরে ইন্টারনেট সুবিধা চালু করব। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সব বিমানবন্দরে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা চালু করেছি। আমরা আমাদের কথায় অটল আছি—বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে যে ওয়াই-ফাই সেবা দেওয়া হচ্ছে, তার গতি ও নির্ভরযোগ্যতা বিশ্বের যেকোনো বিমানবন্দরের সঙ্গে তুলনীয়। সিঙ্গাপুর, দুবাই, হিথ্রো বা নিউয়ার্ক—যেখানেই যান না কেন, বাংলাদেশের বিমানবন্দরের নেটওয়ার্কের গতি ও নির্ভরযোগ্যতা কোনো অংশে কম হবে না।
আমাদের কাছে মূল বিষয় প্রযুক্তির ধরন নয়। যেখানে ফাইবার সবচেয়ে উপযোগী, সেখানে ফাইবার ব্যবহার করব। যেখানে ওয়্যারলেস সবচেয়ে কার্যকর, সেখানে ওয়্যারলেস ব্যবহার করব। আর যেখানে স্যাটেলাইট সবচেয়ে উপযোগী, সেখানে স্যাটেলাইট ব্যবহার করব। আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কীভাবে শেষ ব্যবহারকারীর কাছে সর্বোত্তম সেবার অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়া যায়।
ঢাকা স্ট্রিম: যদি বাজেটে আইসিটি খাতের স্পিরিটটাকে যদি কয়েক বাক্যে সংক্ষেপে বলতেন।
রেহান আসিফ আসাদ: পুরো বিষয়টির সারসংক্ষেপ করলে আমরা বলতে পারি—আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে বিশ্বের পরবর্তী প্রযুক্তি কেন্দ্র বা ‘টেক হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা।
এই প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হবেন আমাদের উদ্যোক্তারা, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা। আর তাদের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা, নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বাজেটের মাধ্যমে আমরা সেই ভিত্তিই তৈরি করছি। বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে যে ধরনের সহায়ক পরিবেশ ও কাঠামো প্রয়োজন, তার প্রাথমিক রূপরেখা ও ভিত্তি এই বাজেটেই স্থাপন করা হচ্ছে।
আমাদের বিশ্বাস, আজ যে ভিত্তি আমরা তৈরি করছি, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছর কিংবা পাঁচ থেকে দশ বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়েছিল ২০২৬ সালে। আর সেই উদ্যোগের ফলাফল ভবিষ্যতের বাংলাদেশে দৃশ্যমান হবে, ইনশাআল্লাহ।