জামায়াতকে সাইজ করার পদ্ধতি যদি অবৈধও হয়, তবুও অনেকে তাতে সমর্থন করেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাতে তা আবার দেখা যাচ্ছে।
১.
সরকার ইসলামী ব্যাংককে জামায়াত মুক্ত করতে চাইছে। কেনো নিয়েছে তা জানার চেষ্টা করেছিলাম। জানতে পেরেছি, সরকারের কেউ কেউ মনে করে, এর মাধ্যমে বিরোধীদলকে আর্থিকভাবে সাইজ করা যাবে। 'প্রতিবেদন' আছে জামাত ব্যাংকটি থেকে টাকা পায়। তা বন্ধ করা গেলে, দলটি সরকারকে ডিস্টার্ব করতে পারবে না। ভোটেও দুর্বল হয়ে যাবে।
ঠিক একই ধারনাপ্রসূত হয়ে ফেসবুক দুনিয়ায় বাস করা লোকজনও ইসলামী ব্যাংককে জামায়াত মুক্ত করাকে নিঃশর্ত সমর্থন করছে। এর কী কুফল কী, তা পরে বলছি।
২.
আমি সরকারের ভাই বেরাদরদের বলেছি, এই প্রতিবেদনটি ভুয়া। তাদের যা বলেছি, আপনাদেরও বলি। জামায়াত ব্যাংক থেকে সরাসরি টাকা পায় না। একটা নেতা আছে না যে ফেসবুকে এসে 'ইয়ানতবাজির' কথা বলেন, ওইভাবে কোনো ব্যাংক কোন দলকে টাকা দেয় না, দিতে পারেও না।
তাহলে ইসলামী ব্যাংক থেকে জামায়াত কী পায়? পায় হলো সাপোর্ট। জামায়াতের নেতারা ব্যবসার জন্য এই ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পান। আর শিবিরের নেতাকর্মীরা সহজে চাকরি পান। (সিলেবাস কমন হয়ে যাওয়ার পর এখন অবশ্য সহজ নাই)।
জামায়াতকে আর্থিকভাবে দুর্বল করতে আওয়ামী লীগও ব্যাংকটির দখল করেছিল এস আলমের মাধ্যমে। তাতে লাভ হয়নি। জামায়াতের লোকজন ঋণ ঠিক পেয়েছে। যেমন নাবিল গ্রুপ। এস আলমের সঙ্গে খাতির করে অনিয়ম এবং কায়দাকানুন করে ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। তবে নাবিল গ্রুপ পালিয়ে না গিয়ে ৫ আগস্টের পর ১১০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের কিছু ডাউন পেমেন্ট দিয়ে রিশিডিউল করে, এখন কিস্তি দিচ্ছে। জামায়াতের পরিচিত নেতারা এস আলম জামানায় ঋণ না পেলেও, কর্মকর্তারা সব আগের হওয়ায় অপরিচিতি মুখের নেতারা ঠিক ঋণ পেয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের সিএসআর থেকে জামায়াতের যারা গরিব তারা দান খয়রাত পায়। আবার বিনাজামানতের আরডিএসের ক্ষুদ্র ঋণ পায়। তবে এই স্কিমে টাকা ফেরত দেওয়ার হার খুব ভালো। ৯৮ শতাংশের বেশি। মানে টাকা নিলেও মারে না। ১০০ টাকা ঋণ দিলে ৯৮ টাকা ফেরত আসে। প্লাস মুনাফা আসে। ব্যাংকের জন্য লাভজনক এই প্রজেক্ট। ব্যাংক ও জামায়াত উভয় পক্ষের জন্য উইন উইন সিচুয়েশন।
৩.
জামায়াত বিট কাভার করছি ১৭ বছর। এই হিসেবে দীর্ঘতম সময় ধরে দলটিতে পর্যবক্ষণে আমাকে 'ছিনিয়র সাংবাদিক' (হা হা হা) বলা যায়। নতুন কয়েকজন সাংবাদিক খুব ভালো করছে জামায়াত বিটে। তবে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, এই কয়েকজনের বাইরে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের প্রায় সবার জামায়াত সম্পর্কে জানাশোনা জিরো। গালগল্প সর্বস্ব। তাদের বড় অংশ জামায়াতবিদ্বেষী এবং বাকিরা জামায়াত সমর্থক। একপক্ষ যে কোনোভাবে জামায়াতের ধ্বংস চায়। এতে অন্যায় হলেও, সমস্যা নেই। আরেকপক্ষ জামায়াতের কোনো ভুলই দেখে না।
৪.
২০১৩ থেকে পরের চার বছর শাহবাগ, আবুল বারাকাত করে করে কীভাবে ইসলামী ব্যাংক দখলের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে, তা আপনাদের জানা। কীভাবে ডিজিএফআই দিয়ে এস আলম ২০১৭ সালে ব্যাংক দখল করল, কীভাবে এস আলম নামে বেনামে ৮৭ হাজার কোটি ঋণের নামে নিয়েছে এগুলোও এখন সবার জানা।
এস আলম মুক্ত করার পর ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটা একটু একটু ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর ব্যাংকটিতে মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। যেটা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকা। একটা বিধ্বস্ত ব্যাংক এক বছরে ২২ হাজার কোটি নতুন আমানত সংগ্রহ করতে পারা বিরাট অর্জন।
মুশকিল হলো ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণ দিয়ে বসে আছে ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ৯৪ হাজার কোটি টাকা। এর আবার বড় অংশ পটিয়ার পীর সাহেবের। এসব ঋণ কিয়ামত পর্যন্ত আদায়ের সম্ভাবনা নেই। ফলে ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা যদি ব্যাংক থেকে তাদের টাকা তুলতে যায়, অর্ধেক টাকাও ফেরত পাবে না এই জীবনে।
৫.
তো এই পরিস্থিতিতে রাজনীতি না করে ব্যাংকটিকে রিকভারি দরকার ছিল। কিন্তু তা না করে সাইজ করার নীতি নেওয়া হয়েছে। ফলে আন্দোলন হচ্ছে, এতে আতঙ্কিত গ্রাহক টাকা তুলতে শুরু করেছে।
এক সপ্তাহে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে আমানতকারীরা। পরিস্থিতি এমন সিআরআর রাখতে না পারা ইসলামী ব্যাংক এখন ১০ হাজার কোটি ঋণ চাইছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে।
আজ সংসদে যেটা হলো, তাতে আতঙ্ক আরও বাড়বে। আজ সংসদে বলা উচিত ছিল, সরকার ব্যাংকে হাত দিচ্ছে না, দেবেও না। কাউকে হাত দিতে দেওয়াও হবে না। আমানতকারীদের টাকা একদম নিরাপদ।
সেটা না করে মন্ত্রীরা যেভাবে পুরনো শেয়ার মালিকদের কাছে ব্যাংক ফেরত দেওয়া, আন্দোলনকারীদের শনাক্তের কথা কথা বললেন, তাতে আরও প্যানিক ছড়াবে।
আমানতকারীরা আরও হুমড়ি খেয়ে পড়বে টাকা তুলতে। ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন টাকা তুলতে না পারলে, তখন আরও আতঙ্ক বাড়বে, তাতে এক হাজার আমানতকারী আসবে টাকা তুলতে।
কোনো ব্যাংকের ৫ শতাংশ গ্রাহকও যদি এক সঙ্গে টাকা তুলতে চায়, দুনিয়ার সেরা ব্যাংকও তা দিতে পারবে না। কারণ ব্যাংক আমনতাকারীর টাকা ভল্টে রেখে দেয় না। ঋণ দেয়। ঋণ গ্রহিতা তো ঋণ নিয়েছে ৫-১০-১৫-২০ বছরের মেয়াদে। চাইলেও ব্যাংক তার কাছ থেকে কিস্তির বেশি টাকা দাবি করতে পারবে না।
কিন্তু আমানতকারী যদি বলে, "মুনাফা লাগবে না, আমার টাকা ফেরত দাও।" এই পরিস্থিতি তৈরি হলে, ব্যাংক দেউলিয়া হতে বাধ্য।
যদিও ফেসবুকে অনেকে বলেন, চেয়ারম্যান পছন্দ না হলে আন্দোলন করার কী আছে, টাকা তুলে অন্য ব্যাংকে চলে যাক। দে আর রঙ।
৬.
এস আলমের খেয়ে যাওয়া যে পাঁচ ব্যাংক দুর্বল হয়েছে, সেগুলোর মোট আমানত পরিমাণ প্রায় ১ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকা। সেগুলোকেই সামলানো যাচ্ছে না। আর ইসলামী ব্যাংক তো হাতি। সাইজেও বড়, খায়ও বেশি। এটা দেউলিয়া হলে, দেশের ব্যাংকিং সেক্টর কলাপস করবে।
অর্থনীতি চলে বিশ্বাস দিয়ে। কাগজের একটা টুকরাকে সরকার বলছে, 'এটা ১০০০ টাকা'। আমরা মেনে নিচ্ছি, কারণ গ্যারান্টি দিচ্ছে সরকার। এই বিশ্বাসেই দোকানে এই কাগজ দিলে এক হাজার টাকার মাল দিচ্ছে। বিশ্বাস না করলে, এটা একটা কাগজ মাত্র।
ব্যাংকও তাই। নিরাপদ থাকবে বিশ্বাসেই মানুষ টাকা রাখে। বিশ্বাস ভেঙে গেলে, মানুষ টাকা তুলে নেবে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতি পৌনে ১০ শতাংশ। টাকা তুলে নিলে, বাজারে টাকা বাড়বে। জিনিসপত্রের দাম বাড়বে।
ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করার মত ঋণ পাবে না। তাতে স্থানীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হবে না। সরকারও ঋণ পাবে না। তখন টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিতে হবে। এর ফল হবে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি।
এতে যতটা না জামায়াত বা সরকারের ক্ষতি হবে, দেশের হবে এর কয়েকগুণ। সরকারি দলকে বলি, আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতকে যদি সাইজ করতে হয়, অন্য কোনো তরিকা বের করুন। কিন্তু ব্যাংকিং খাতে হাত দিয়েন না। এটা সুসাইডাল হবে।
লেখক : সাংবাদিক
লেখাটি লেখকের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নেওয়া