Image description

আসন্ন ডেঙ্গু মৌসুমে সংক্রমণের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সতর্ক বার্তার পর, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা বাড়াতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার।

সিটি করপোরেশনগুলো বেশ কয়েকটি এলাকায় উচ্চ মাত্রায় মশার লার্ভা পাওয়ার কথা জানানোর পর, কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অব্যাহত উদ্বেগের মাঝেই এই উদ্যোগ নেওয়া হলো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং এই সময়ে নতুন কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৮৪৪ জন সংক্রমিত হয়েছেন এবং ছয়জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।

ডিজিএইচএস’র উপাত্ত আরও দেখায়, ডেঙ্গু একটি পুনরাবৃত্তিমূলক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জন, ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা মারাত্মক মৌসুমী প্রাদুর্ভাবের একটি ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং কীটতত্ত্ববিদরা সতর্ক করেছেন, আগামী মাসগুলোতে, বিশেষ করে ভারী বর্ষণ ও পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ আরও তীব্র হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগামী মাসগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, যেখানে আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে সংক্রমণের সর্বোচ্চ সময় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এর মাত্রা সীমিত করা সম্ভব।’

একটানা বৃষ্টিপাত মশার প্রজননকে ত্বরান্বিত করবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

আইইডিসিআর’র সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মো. মুশতাক হোসেন বলেন, গত কয়েক বছর ডেঙ্গু ভাইরাস সেরোটাইপ ২ ও ৩-এর আধিপত্যের পর, চলতি বছর যদি সেরোটাইপ ১ অথবা ৪ প্রধান হয়ে ওঠে, তবে পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি ঘটতে পারে।

সরকারকে চিকিৎসা সেবা বিকেন্দ্রীকরণ এবং মানুষের বাড়ির কাছাকাছি বিনামূল্যে ও সহজে পরীক্ষার ব্যবস্থা করার ওপর জোর দেওয়ার আহ্বানও জানান এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ দায়ভার এককভাবে নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নীতির সমালোচনা করে মুশতাক বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ একটি যৌথ দায়িত্ব এবং এটি কেবল একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।’

তিনি উল্লেখ করেন, সহজলভ্য পরীক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সময়মতো চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

মুশতাক হোসেন পরামর্শ দেন, যেসব রোগীর তিন দিনের মধ্যে কোনো উন্নতি হবে না, তাদের টারশিয়ারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর ভিড় এড়াতে কাছাকাছি সেকেন্ডারি পর্যায়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে–উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স–ভর্তি হওয়া উচিত।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মো. আতিকুল ইসলামও মৌলিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়ে টাইমসকে বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং মানুষকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি প্রতিটি পরিবারকে নিয়মিত তাদের চারপাশ পরিদর্শন করতে এবং জমে থাকা পানি অপসারণ করার অনুরোধ জানান।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি ঢাকার রবীন্দ্র সরোবরে তিন মাসব্যাপী দেশব্যাপী ডেঙ্গু সচেতনতা অভিযানের উদ্বোধন করেন এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ঘোষণা দেন।

এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মাইকিং, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং নির্বাচিত ওয়ার্ডগুলোতে সপ্তাহব্যাপী ক্রাশ প্রোগ্রাম। এ ছাড়া, যেসব প্রতিষ্ঠানে এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া যাবে, তাদের জরিমানা করতে শিগগির ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামবে।

মন্ত্রী এই মৌসুমে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতাসহ মারাত্মক কেস বা রোগীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনাই হলো প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।

প্রাক-মৌসুম মূল্যায়নের পর সিটি করপোরেশনগুলো নজরদারি জোরদার করেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) কর্তৃপক্ষ মশার উল্লেখযোগ্য উপদ্রব চিহ্নিত করেছে।

ডিএসসিসি’র ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেই এডিস মশার ঘনত্ব নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক ওপরে পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শনাক্ত হওয়া প্রজননস্থলগুলোর মধ্যে ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ বহুতল ভবন, ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ একক পরিবারের বাড়ি, ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবন এবং ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ আধা-পাকা স্থাপনা। মশার প্রজননের সাধারণ উৎসের মধ্যে রয়েছে মেঝের জমে থাকা পানি, বালতি ও প্লাস্টিকের পাত্র।

ডিএসসিসি’র প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিশাত পারভীন টাইমসকে জানান, এসব প্রজননস্থল ধ্বংস করতে কর্মকর্তারা পাঁচ দিন ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিদর্শন করবেন। তিনি আরও জানান, পুরো শহরজুড়ে একটি সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযান ইতিমধ্যে চলমান রয়েছে।

এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) নিজস্ব উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং মতবিনিময় সভা শুরু করেছে। ডিএনসিসি’র প্রশাসক মো. শফিবুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জানান, নাগরিকদের চব্বিশ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সিটি করপোরেশন নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছে।