দেশের হাসপাতালগুলোতে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) নিয়ে রোগী ও স্বজনের মধ্যে নানা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। অনেকের কাছে, আইসিইউ মানেই মৃত্যুর শেষ ধাপ, এখানে কোনো চিকিৎসা হয় না। আবার কেউ মনে করেন, আইসিইউতে নেওয়া মানেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ানো। এসব ধারণায় কখনো কখনো চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এমন একটি বিশেষায়িত ইউনিট, যেখানে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের উন্নত জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখানকার চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কম জানেন। এর পাশাপাশি চিকিৎসক-রোগী যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক গুজবের কারণে এক ধরনের ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে, রোগীর স্বজনদের নিয়মিত ব্রিফিং, চিকিৎসা পরিকল্পনা সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ফলাফল খোলামেলা জানানো হলে এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
দেশে প্রয়োজনের তুলনায় আইসিইউর সংখ্যা খুবই কম। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের আইসিইউতে শয্যা আছে ১ হাজার ৩৭২টি। আন্তর্জাতিকভাবে আইসিইউর জন্য এককভাবে কোনো বৈশ্বিক মানদণ্ড নেই। তবে উন্নত দেশেগুলোতে এক লাখ লোকের জন্য ১৭টি শয্যা থাকে। বাংলাদেশের সরকারি খাতে প্রতি লাখ মানুষের জন্য একটিরও কম শয্যা বরাদ্দ আছে। রাজধানীর বাইরে অনেক জেলায় পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা নেই। এমনকি বিভাগীয় পর্যায়ে অনেক বড় হাসপাতালেও অাইসিইউ সুবিধা নেই।
একটি সরকারি হাসপাতালের আইসিউতে ১৭ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন মোহাম্মদ রাশেদ। তিনি আইসিইউতে থাকাকালীন সেখানকার বেশিরভাগ রোগী মারা গেছেন। রাশেদ বলছেন, ‘প্রতিদিনই দেখি, পাশের বেডের রোগী মারা যাচ্ছে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, মারা যাব। এক পর্যায়ে ভেবেছিলাম, ঠিকঠাক চিকিৎসা চললে নিশ্চয়ই এত রোগী মারা যেত না।’
এই রোগীর বোনের ছেলে জুয়েল রানা মামার চিকিৎসার দেখভাল করেছেন। জুয়েল রানা বলেছেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হয়ে মামার ফুসফুস বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইসিইউতে থাকাকালীন চিকিৎসকরা একটা নির্দিষ্ট সময়ে রোগীর সম্পর্কে জানাতেন, তাও তেমন বিস্তারিত নয়। আবার খোঁজখবর নিতে গেলে অনেক সময় চিকিৎসক-নার্সের খারাপ ব্যবহারের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তখন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বুঝতে পারছিলাম না, আসলেই মামার সঠিক চিকিৎসা চলছিল কি না বা অপ্রয়োজনে আইসিইউতে রাখা হচ্ছে কি না। তখন অন্য হাসপাতালের একজন চিকিৎসক, যিনি দূরসম্পর্কের আত্মীয়, তার মাধ্যমে মামার খোঁজ-খবর রাখতাম।’
আইসিইউর চিকিৎসা সম্পর্কে এই আস্থার সংকট শুধু এই পরিবারের নয়; আইসিইউর চিকিৎসা সম্পর্কে মানুষ কী ভাবে— জানতে এই প্রতিবেদক অন্তত ৩০ জন রোগী ও রোগীর স্বজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাদের অনেকেরই নিজে অথবা স্বজনদের আইসিইউতে চিকিৎসা করানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তারা বলছেন, আইসিইউতে নেওয়ার পরে বেশির ভাগ সময় রোগীর অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন না। অনেক সময় রোগী ঠিক কী কী সমস্যায় ভুগছেন, তাও বিস্তারিত তথ্য দেন না। খরচ কেমন হতে পারে, জানাতে পারেন না। তবে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, অনেক সময় জানেন না ঠিক কী অসুবিধায় রোগীকে আইসিইউতে নিতে হবে। আবার এক রোগী জানান, তাকে বিনা দরকারে অাইসিইউতে একদিন বাড়তি রেখেছিল, যার জন্য অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে ৪২ হাজার টাকা। পরে সেখানকার এক পরিচিত চিকিৎসক, যিনি তার ভাইয়ের সহপাঠী ছিলেন, তার পরামর্শে নিজ উদ্যোগে ছুটি নেন এই রোগী।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অবগত আছেন বলে জানান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা যে একজন রোগীর অধিকার, সেটি অনেক সময় আমরা চিকিৎসকরা ভুলে যাই। রোগী বা রোগীর স্বজনদের উদ্বেগ আইসিইউতে অনেক বেড়ে যায়, যা আমরা বুঝতে চাই না।’
তিনি আরও বলছেন, সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের অভাবে আস্থার সংকট তৈরি হতে হতে এমন অবস্থায় গিয়েছে যে, রোগীরা চিকিৎসকদের ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না। আর সময়ের অভাবে চিকিৎসকরাও তাদের ভুল ভাঙানোর সুযোগ পান না। অনেকে আবার এর প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেন না। এর সমাধান দরকার।
দেশে শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় হাসপাতাল রাজধানী শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। এই হাসপাতালে সাতটি আইসিইউতে শিশুদের সেবা চলে। এই হাসপাতালের দোতলার পিআইসিইউর সামনে দেখা যায়, সংকটাপন্ন এক নিউমোনিয়ার রোগী আসতেই চিকিৎসক-নার্স ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসক সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন, নার্স সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে পিআইসিইউর রেজিস্ট্রার বলছেন, এখানে ১৬টি শয্যায় রোগীদের চিকিৎসা চলে। সংকটাপন্ন এই রোগীদের জন্য চিকিৎসক আছেন মাত্র সাতজন। এর মধ্যে দুপুর ২টা থেকে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত মাত্র একজন চিকিৎসক থাকেন। তিনি তো এক রোগী সামলে অন্য রোগীর কাছে যেতেই দেখা যায়, পরের রোগীর কাছে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাইরে স্বজনরা অপেক্ষায় থাকেন, তার রোগীর খবর জানার জন্য। কিন্তু বাস্তবে এই চিকিৎসকের কাছে রোগীর পরিস্থিতি বা অন্য কোনো আপডেট জানানোর সময় নেই।
এই রেজিস্ট্রার বলছেন, নার্সদের অবস্থা আরও শোচনীয়। চিকিৎসকরা তো শুধু কী করতে হবে, নির্দেশ দেন। এর বাস্তবায়ন করতে হয় নার্সদের। আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, আইসিইউতে প্রত্যেক রোগীর জন্য একজন করে নার্স রাখার কথা। সেখানে ১৬ জন রোগী সামলাতে গিয়ে এই নার্সকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এতে রোগীও অনেক সময় যথাযথ যত্ন পায় না, অনেক সময় রোগীর স্বজনরাও খারাপ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নেন।
এই রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা শেষ করে আইসিইউর সামনে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। আইসিইউর সেবা নিয়ে তাদের বিস্তর অভিযোগ। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, রোগীর কেমন আছে, তা সবসময় জানতে পারেন না।
এই হাসপাতালের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বলছেন, বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় আইসিইউ বেড এখনো সীমিত। ফলে রোগী স্থানান্তর, বেড সংকট এবং চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ পরিবারগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। এই বাস্তবতাও আইসিইউ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
আইসিইউ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। তিনি বলছেন, ভুল তথ্য ও ভয় রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। আইসিইউকে ‘মৃত্যুকক্ষ’ নয়, বরং ‘জীবনরক্ষাকারী বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিট’ হিসেবে জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা কার্যক্রম, হাসপাতালভিত্তিক তথ্যসেবা এবং চিকিৎসক-রোগী যোগাযোগের উন্নয়ন।