Image description

পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট, দেশের ভঙ্গুর দশা থেকে উত্তরণ এবং স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল করতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনতে চায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সীমিত সম্পদের মধ্যে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। এমন লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একটি বিশেষ কৌশলগত রূপরেখা ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার।

বাজেটে শুধু ঘাটতি পূরণের প্রথাগত হিসাব-নিকাশ নয়, বরং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে পড়া বিনিয়োগে গতি ফেরানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। খাদের কিনারে পৌঁছানো অর্থনীতিকে টেনে তুলতে এই বাজেটকে একটি বড় চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে সরকার।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে রোববার (৭ জুন) বিকেল ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন।

জাতীয় সংসদ সচিবালয় এ তথ্য জানিয়েছে। এর আগে ৭ মে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সংসদ সচিবালয়।

সংসদ সচিবালয় জানায়, রাষ্ট্রপতির এই আদেশ জারির পর সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে অধিবেশনটি যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি ঢাকার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে এই অধিবেশন শুরু হবে। মূলত এই অধিবেশনেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ ও পাস করার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৯ শতাংশ বেশি। তবে এই উচ্চাভিলাষী বাজেটের বিপরীতে আয়ের খাত নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলতি অর্থবছরই সরকার রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতির মুখে পড়েছে, যার পরিমাণ গত ১০ মাসেই এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

সম্ভাব্য বাজেট প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি বড় আকারের বা উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করা হয়তো সহজ, কিন্তু বর্তমানের ভঙ্গুর ও ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতি স্থিতিশীলতা ও টেকসই সমৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই কঠিন বাস্তবতা সামনে রেখেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’ বা ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি। এই দর্শনের মূল অঙ্গীকারই হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মকাণ্ডের সুফল যেন কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে।

বাজেটে আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন (জিওবি) ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে আরও ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে। সব মিলিয়ে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি টাকার বেশি।

এবারের বাজেটে এডিপিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বড় অংশজুড়ে রয়েছে ‘থোক বরাদ্দ’। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট উন্নয়ন বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। বিপরীতে সরাসরি প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত—৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে থোক বরাদ্দের পরিমাণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা, অথচ একই খাতে থোক বরাদ্দ ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। বাজেটে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ—৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।

তবে বড় আকারের এডিপি ও বিপুল থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার হয়েছে মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ অবস্থায় আরও বড় উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
 
বাজেটে প্রস্তাবিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৪৯টি এবং কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৭টি। পাশাপাশি ১ হাজার ২৭৭টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্পও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

প্রতি বছর জুন মাসে জাতীয় বাজেটের ওপর আলোচনার জন্য সংসদ অধিবেশন বসে, যা বাজেট অধিবেশন হিসেবে পরিচিত। আসন্ন অধিবেশনে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতিফলন হিসেবে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে এবং এর ওপর সংসদ সদস্যরা বিস্তারিত আলোচনায় অংশ নেবেন। এর আগে গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে, যা শেষ হয় গত ৩০ এপ্রিল।