Image description

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাসরুম, লেকচার আর পরীক্ষাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশ, নেতৃত্বগুণ অর্জন এবং বাস্তব জীবনের নানা দক্ষতা গড়ে তোলার এক বিস্তৃত ক্ষেত্র। এই বিকাশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সংগঠন, ক্লাব ও অ্যাসোসিয়েশন। প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীরা এসব গঠনমূলক, সাংস্কৃতিক কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারেন। 

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় এসব সংগঠনের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে ডিবেটিং সোসাইটি, বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, বাঁধন, ডিউমুনা, কাম ফর রোড চাইল্ড, রেড ক্রিসেন্ট ইয়ুথ, ভলেন্টিয়ার ফর বাংলাদেশ, ক্যারিয়ার ক্লাব, বিজনেস ক্লাব, এন্ট্রাপ্রেনারশিপ ক্লাব, রিসার্চ সোসাইটি, সায়েন্স ক্লাব, এনভায়রনমেন্টাল ক্লাব, ফটোগ্রাফি ক্লাব, ফিল্ম সোসাইটি, থিয়েটার গ্রুপ ও মিউজিক ক্লাবসহ আরও বিভিন্ন সংগঠন।

ডিবেটিং সোসাইটিতে যুক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা যুক্তি উপস্থাপন, বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনা এবং জনসমক্ষে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলার দক্ষতা অর্জন করছেন, যা ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ এবং দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা গড়ে তুলছে। এছাড়াও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা বাস্তব জীবনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন। 

এদিকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে বাঁধন স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানবসেবায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। কাম ফর রোড চাইল্ড সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও কল্যাণে কাজ করে শিক্ষার্থীদের সামাজিক দায়িত্ববোধকে আরও গভীর করে তুলছে।রেড ক্রিসেন্ট ইয়ুথ ও ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ কার্যক্রম এবং জরুরি মানবিক সহায়তায় কাজ করে শিক্ষার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি, যোগাযোগ দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করছে ক্যারিয়ার ক্লাব, বিজনেস ক্লাব ও এন্ট্রাপ্রেনারশিপ ক্লাব।

রিসার্চ সোসাইটি ও সায়েন্স ক্লাব গবেষণামুখী চিন্তা, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও উদ্ভাবনী মনোভাব তৈরি করছে। এনভায়রনমেন্টাল ক্লাব পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে ফটোগ্রাফি ক্লাব, ফিল্ম সোসাইটি, থিয়েটার গ্রুপ ও মিউজিক ক্লাব সুযোগ তৈরি করছে।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম হলো- ঢাকা ইউনিভার্সিটি মডেল ইউনাইটেড নেশনস অ্যাসোসিয়েশন (ডিউমুনা (ডিউমুনা), যেখানে শিক্ষার্থীরা মডেল ইউনাইটেড নেশনসের কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি হিসেবে বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও নীতিনির্ধারণী সিমুলেশনে অংশ নিয়ে কূটনৈতিক দক্ষতা অর্জন করেন।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের ২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সামিউস শাহির বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি-এই সংগঠনগুলো আমাদেরকে অনেক ধরনের জিনিস শেখায়, যেটা পরবর্তীতে জীবনে স্পেশালি জব লাইফে গিয়ে অনেক কাজে আসবে। যেমন সবচেয়ে ইম্পোর্টেন্ট স্কিলটা হচ্ছে মানুষের সাথে মেশার যে স্কিলটা, সময়ের কাজ সময়ে করা, চাপের মাঝেও কাজ কমপ্লিট করা। 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সুবর্ণ আসসাইফ বলেন, ‘সহ-শিক্ষা আর সাংগঠনিক দক্ষতা যে একজন মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে, সেটা নিজের জীবন দিয়েই সবচেয়ে ভালো উপলব্ধি করেছি। ক্যাম্পাসে হাজার হাজার মানুষের সামনে একটা বড় ইভেন্ট হোস্ট করা, কিংবা একটা আস্ত ম্যাগাজিন পাবলিশ করার পেছনে যে কী পরিমাণ মেহনত আর থ্রিল থাকে, তা যারা করেছে শুধু তারাই বুঝবে। আজ যখন প্রফেশনাল লাইফে কাজ করছি, তখন প্রতিনিয়ত টের পাই ওই দিনগুলোর গুরুত্ব। যেকোনো ক্রাইসিস মোমেন্টে প্রবলেম সলভিং বা মানুষের সাথে নেটওয়ার্কিংয়ের যে আত্মবিশ্বাস তার পুরো ক্রেডিটই আসলে স্কুল-কলেজ আর ভার্সিটির ওই ক্লাব অ্যাক্টিভিটিজের। ওগুলো শুধু শখ ছিল না, লাইফের আসল গ্রুমিংটাই হয়েছিল ওখানে ।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অ্যাকাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি সংগঠনভিত্তিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্যও  প্রস্তুত করে এবং তাদের আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।’

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি)  উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীজনের সাথে মতবিনিময় সভা করেছি। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা, বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং আমার কাছে তাদের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানা। বিশেষ করে ক্লাস প্রতিনিধি ও বিভিন্ন ক্লাব প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছি, যেখানে তারা অত্যন্ত খোলামেলাভাবে তাদের সংকট ও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে। আমি প্রতিটি বিষয় গুরুত্বসহকারে নোট করেছি। পর্যায়ক্রমে এই সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান করাই আমার লক্ষ্য। শিক্ষা, গবেষণা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার ও প্রত্যাশা পূরণ করাই আমার মূল দর্শন।’