Image description

যশোরের বেনাপোল সীমান্তে বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের মধ্যকার ঐক্য, দেশপ্রেম ও সাহসিকতা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) পিছু হটতে বাধ্য করেছে বলে জানা গেছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয়দের পুশইনের অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিজিবি ও এলাকাবাসী আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিজিবি ও সীমান্ত এলাকার জনগণের সঙ্গে কথা বলে এমনটা জানা গেছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তের ওপারে ১০০ থেকে ১২০ জন ভারতীয়কে বাংলাদেশের ভেতর পুশইন করার জন্য জড়ো করে বিএসএফ। তারা অন্তত তিনটি গাড়িতে করে এসব ভারতীয়কে সীমান্তে আনে বলে বিজিবির কাছে খবর ছিল। ওই খবরের পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তুত ছিল বিজিবি।

গত ৩১ মে রাতে বিএসএফ বেনাপোল সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার গেট খুলে নারী ও শিশুসহ ৮-১০ ভারতীয়কে বাংলাদেশে পুশইনের অপচেষ্টা করে। বিজিবি এসব ভারতীয়কে পুশইনের অপচেষ্টা ঠেকিয়ে দেয়। তখন বাধ্য হয়ে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে থাকেন।

বাংলাদেশের চেয়ে ভারত ভূখণ্ড অনেক বড় এবং সামরিক শক্তিতেও অনেক এগিয়ে। তাহলে বিজিবি কীভাবে বিএসএফের এ তৎপরতা রুখে দিল—এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিবি যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সীমান্তে বিজিবি বা বিডিআরের সঙ্গে বিএসএফের খণ্ডযুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেন—তাদের কি কোনো জয়ের ইতিহাস আছে? পদুয়া, রৌমারী, বড়ইবাড়ীসহ কোথাও কি বিজিবি বা বিডিআর হেরেছে? তাহলে শুধু বড় দেশ বা বিশাল বাহিনী থাকলেই হয় না। কাজটা আপনি বৈধ করছেন নাকি আপনার সরকার চেয়েছে তাই করতে বাধ্য হচ্ছেন, এর ওপর নির্ভর করে আপনার মনোবল ও সাহসিকতা।

বিজিবির এই কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, পৃথিবীর সব দেশের প্রতিবেশী ও সীমান্ত আছে। কিন্তু কোথাও এভাবে লোকজনকে ঠেলে অন্য দেশে পাঠানোর নজির নেই। বিএসএফ যাদের জোর করে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তারা আদৌ বাংলাদেশি কি না, সেই প্রমাণ আমাদের কাছে নেই।

তিনি বলেন, যদি তারা সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন এবং কোনো কারণে ভারতে আটকা পড়েন, তো তাদের এ দেশে ফেরত পাঠানোর কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভারত সেটি করতে পারে।

বিএসএফের এসব কাজ অবৈধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যাচাই-বাছাইয়ে যদি প্রমাণ হয় ওই লোকগুলো বাংলাদেশি, তাহলে তাদের যেকোনো ইন্টারন্যাশনাল চেকপোস্ট (আইসিপি) দিয়ে আইনগতভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব। কিন্তু বিএসএফ সেটা না করে রাতের আঁধারে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। এখানে আইনগতভাবে আমাদের অবস্থান পুরোপুরি বৈধ, বিএসএফের অবস্থান অবৈধ। সে কারণে আমাদের মনোবল অনেক বেশি ছিল।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মানুষের দেশপ্রেম অসাধারণ। তারা বিজিবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তথাকথিত পুশইনের চেষ্টা রুখে দিতে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।

সীমান্তে বিএসএফের পুশইন প্রতিরোধে সরকারের সদিচ্ছা ও জনগণের সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে সাইফুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত রক্ষা আমাদের কাজ। কিন্তু এ দেশের সরকারের সদিচ্ছা ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরো বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সীমান্তবর্তী এলাকায় অনবরত মাইকিং করছি। সেখানে ভারত থেকে যেকোনো ধরনের তথাকথিত পুশইনের চেষ্টা রুখে দিতে সীমান্তবাসীকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। জনগণও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিচ্ছে। যতদিন প্রয়োজন মনে হবে, ততদিন মাইকে প্রচার চলবে বলে জানান তিনি।

তথাকথিত পুশইনের সময় অবনতিশীল পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়। সেখানে বিএসএফের পক্ষ থেকে কী যুক্তি দেওয়া হয়—জানতে চাইলে বিজিবির এই ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক বলেন, তারা আসলে সেখানকার নবনির্বাচিত রাজ্য সরকারের অসৎ ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে। সে কারণে তাদের কাছে কোনো যুক্তি নেই।

বিজিবির এই কর্মকর্তা বলেন, তারা পতাকা বৈঠকে অলীক কথাবার্তা বলে। এমনকি বিএসএফ মানুষজনকে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টার অভিযোগও অস্বীকার করে বলে জানান তিনি।

যশোর এলাকায় বিজিবির একটি থেকে আরেকটি আউটপোস্টের গড় দূরত্ব পাঁচ-ছয় কিলোমিটার। একেক আউটপোস্টে সামান্য কিছু জনবল থাকে। তাদের পক্ষে বিএসএফের সংঘবদ্ধ আগ্রাসী তৎপরতা রুখে দেওয়া জনগণের সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়।

এ প্রসঙ্গে বেনাপোলের যে সাদিপুরের মাঠ দিয়ে বিএসএফ লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে, ওই গ্রামের বাসিন্দা রাকিব আহমেদ আমার দেশকে বলেন, ১ জুন সকালে আমরা জানতে পারি বিএসএফ কিছু লোককে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা বিজিবি প্রতিহত করেছে। এরপর আমরা গ্রামবাসী একযোগে বিজিবির পাশে দাঁড়াই। সামান্য কয়েকজন বিজিবি সদস্যের সঙ্গে আমরা বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সীমান্ত পাহারা দিতে থাকি।

তিনি জানান, এরপর মিডিয়া ও রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনায় বিএসএফ বুঝে ফেলে তাদের চেষ্টা ব্যর্থ। সে কারণে তারা দুদিন পর রাতের আঁধারে ওই লোকগুলোকে শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। নতুন করে কাউকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টাও করেনি।

সাদিপুর গ্রামের আরেক বাসিন্দা শাকিল হোসেন বলেন, আমরা বিজিবির সঙ্গে থেকেই বিএসএফের অপতৎপরতা রুখে দিয়েছি। রাতে টর্চ হাতে বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করেছি। যতদিন প্রয়োজন হবে, আমরা এভাবে বিজিবির পাশে থাকব।

সাদিপুর গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করেন, বিজিবি-জনতার ঐক্য যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলা করতে সক্ষম। এ সীমান্তে গত কয়েক দিনের ঘটনা তা আবার প্রমাণ করেছে।