Image description

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে নিয়োগ, অবৈধভাবে পদোন্নতি, বাজেট বরাদ্দে দুর্নীতি, বিভিন্ন প্রকল্পে টাকা নয়-ছয়ের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব অনিয়মে প্রায় এক ডজন কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল নিয়োগ, পদোন্নতিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বিটিআরসিতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে জুনিয়র পরামর্শককে রাজস্ব খাতের বিভিন্ন পদে নিয়োগ করার বিষয়ে তাদের কাছে তথ্য ছিল। অভিযানকালে এনফোর্সমেন্ট টিম নিয়োগ ও পদোন্নতি সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে এবং নথিপত্র জব্দ করে। বয়স শিথিলতার শর্ত পালনের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে রাজস্ব খাতে নিয়োগ এবং বিধিবহির্ভূতভাবে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে নিয়োগের প্রাথমিক সত্যতা পায় দুদক। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম এই অভিযোগের পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কমিশনে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। দুদক জানিয়েছে, গত দেড় দশকে কমিশনে বড় একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। চাকরিবিধি না মেনে নিয়োগ ও পদোন্নতি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি। এমনকি ভুয়া নথিপত্র দিয়ে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, অনুসন্ধান শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীর সঙ্গে বুধবার রাতে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিটিআরসিতে নিয়োগ অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার কারসাজি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়সহ নানা গুরুতর অভিযোগ আসে দুদকের কাছে। এছাড়াও একাধিক ব্যক্তি দুদকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠির মাধ্যমে বিটিআরসির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রদান করে। বিধি লঙ্ঘন করে বিটিআরসিতে পরিচালক, পরামর্শক (কনসালটেন্ট) এমনকি গাড়িচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বয়স চুরির ঘটনা ঘটেছে। যেখানে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে ৫ বছর সেখানে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই বিভিন্ন প্রকল্পে কনসালটেন্ট নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে।

সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে বিটিআরসিতে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত ১২ জনের নিয়োগে অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে দুদক। উপ-পরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি পাওয়া তিন কর্মকর্তা ও ১৭ জন ড্রাইভার নিয়োগে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে দুদক। যারা এই কর্মকাণ্ড করেছে সেই ফ্যাসিবাদী আমলের সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে আছে বিটিআরসিতে। সেই চক্রটি এখনো বিটিআরসিতে সক্রিয় আছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এছাড়াও একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবেদনশীল তথ্য পাচার, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং নিয়মবহির্ভূত বিদেশ সফরের অভিযোগ রয়েছে। পিএইচডি অনুমোদনের আগেই বিদেশ গমন, বছরে একাধিকবার বিদেশ সফর এবং এসব সফরের যথাযথ সরকারি নথি অনুপস্থিত থাকার বিষয়েও প্রমাণ পেয়েছে দুদক।

সূত্র জানায়, টেন্ডার ও প্রোকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় একাধিক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে দুদক। বিশেষ করে কোয়ালিটি অব সার্ভিস যাচাই এবং ইএমএফ রাডিশন প্রকল্পে স্পেসিফিকেশন এমনভাবে তৈরি করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো টিএমএস (টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম) প্রকল্পে অনিয়ম। প্রকল্পটিতে ১১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। তবে এই প্রকল্পে বড় ধরনের নয়-ছয়ের অভিযোগ রয়েছে। দুদক অভিযোগ পেয়েছে, প্রকল্পের স্পেসিফিকেশন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয় এবং যোগ্য অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হয়।

দুদক জানায়, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল মোবাইল অপারেটরদের ডাটা মনিটরিং, রাজস্ব নিরূপণ এবং নেটওয়ার্কের গুণগত মান যাচাই করা। কিন্তু বাস্তবে টিএমএস কার্যকর হয়নি, ডাটা রিকনসিলিয়েশন সম্পন্ন হয়নি এবং সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবুও প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা হয়। এখানে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। দুদক অভিযোগে উঠে এসেছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং অডিট টিমকে বিভ্রান্ত করতে ভুল তথ্য প্রদান করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, টেলিকম নীতিমালা-২০২৫ প্রণয়নেও এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে দুদক। ‘ডি-রেগুলেশন’-এর নামে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়, যা মূলত নির্দিষ্ট মোবাইল অপারেটরদের সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী তৈয়বের সঙ্গে বিটিআরসির এক কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। তৈয়বের প্রভাব ও নির্দেশনায় বিটিআরসির ওই কর্মকর্তা নীতিমালায় এমন পরিবর্তন আনেন যা গোষ্ঠীগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও নকল বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন, আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামে অবৈধভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধা প্রদানসহ একাধিক অভিযোগ দুদকের এনফোর্সমেন্টে উঠে এসেছে।

দুদক জানায়, অনুসন্ধান শেষের পথে। প্রায় এক ডজন কর্মকর্তা এই অনিয়মে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে দুদক বিধি অনুযায়ী মামলা দায়ের করবে।