Image description

২০২৪ সাল। টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার।

সবকিছু যথারীতি পরিচালনা করছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু সরকার গঠনের পাঁচ মাসের মাথায় দেশের ইতিহাসে আলোচিত এক ঘটনার জন্ম দেয় ৫ জুন।
এদিন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া এক রায়ের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনের দুই মাসের মাথায়, ৫ আগস্ট দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

 

সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার।

ঘটনার শুরু যেখানে

২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে সব কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে।

 

তিন বছর পর, ২০২১ সালে সেই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। একই বছরের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৫ জুন রায় দেন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের (বর্তমানে অপসারিত) হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ে কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে কোটা বহাল রাখতে নির্দেশ দিয়ে আদেশ পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে নতুন পরিপত্র জারির নির্দেশ দেওয়া হয়।

নতুন করে আন্দোলন

এরপর জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে নতুন করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। প্রথম কয়েক দিন মিছিল, মানববন্ধনের মতো সাধারণ কর্মসূচি থাকলেও পরে ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে আন্দোলনকারীরা শুরুতে চার দফা দাবিতে বিক্ষোভ করলেও পরে তা এক দফায় নেমে আসে। তাদের দাবি ছিল, সব গ্রেডে সব ধরনের ‘অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক’ কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লিখিত অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ন্যূনতম পর্যায়ে এনে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে কোটা পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে।

আপিল বিভাগে রাষ্ট্র

প্রথম দিকে রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন না করলেও আন্দোলনের মাত্রা বাড়ার পর আবেদন করে। তবে আপিল বিভাগ শুরুতে তাতে সাড়া দেননি। আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে ১০ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা জারি করেন। পরদিন হাইকোর্টের রায়ের আদেশাংশ প্রকাশিত হয়। তিন দিন পর, ১৪ জুলাই প্রকাশিত হয় পূর্ণাঙ্গ রায়।

আন্দোলনকারীদের নিয়ে শেখ হাসিনার মন্তব্য ও ছাত্রলীগের হামলা

এরপরও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকলে ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি আদালতেই নিষ্পত্তি করতে হবে। এছাড়া ‘রাজাকার’ প্রসঙ্গে তার এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়।

এতে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলে পুলিশ গুলি চালায় এবং ছাত্রলীগ হামলা করে। এতে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ ছয়জন নিহত হন। পরদিনও বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। সরকার সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দেয়।

১৭ জুলাই সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি বিশ্বাস করি, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সন্ত্রাসীরা এদের মধ্যে ঢুকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।

তিনি দেশজুড়ে সংঘাতের বিচার বিভাগীয় তদন্তের ঘোষণা দেন এবং সর্বোচ্চ আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ১৮ জুলাই সারা দেশে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় আন্দোলনকারীরা। এতে প্রায় অচল হয়ে পড়ে পুরো দেশ। বিভিন্ন স্থানে নিহত হন ৪১ জন।

সমঝোতা চায় সরকার

১৮ জুলাই দুপুরে এক ব্রিফিংয়ে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, আন্দোলনকারীরা যখন চাইবে, তখনই তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সরকার প্রস্তুত। কোটা সংস্কারের বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে একমত। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের করা আপিলের শুনানি এগিয়ে এনে ২১ জুলাই নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাশাপাশি, শেখ হাসিনার ঘোষণার আলোকে সাম্প্রতিক সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করা হবে বলেও জানান তিনি।

ইন্টারনেট বন্ধ ও কারফিউ জারি

আইনমন্ত্রীর ব্রিফিংয়ের পরও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যান।

একপর্যায়ে সরকার মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ কার্যত বিশ্বের সঙ্গে ডিজিটাল যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

১৮ জুলাইও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে ওই দিন রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

আপিল বিভাগের রায়

কারফিউ চলাকালে ২১ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে কোটা ব্যবস্থার নতুন বিন্যাস নির্ধারণ করেন। রায়ে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকবে। বাকি ৯৩ শতাংশ পদে নিয়োগ হবে মেধার ভিত্তিতে। সরকারকে অবিলম্বে গেজেট জারি করে এ নির্দেশনা কার্যকর করতে বলা হয়।

সেদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। আন্দোলনকারী দুই শিক্ষার্থীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক। রিটকারীদের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।

শুনানিতে মতামত দেন এ এফ হাসান আরিফ (প্রয়াত), আহসানুল করীম, জেড আই খান পান্না, তানিয়া আমীর, তানজীব উল আলম ও সারা হোসেন।

এ ছাড়া আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, এ এম মাহবুবউদ্দিন খোকন এবং ইউনুছ আলী আকন্দও মতামত দেন।

নতুন গেজেট

এরপর সরকার ২৩ জুলাই রাতে গেজেট জারি করে। একই দিন রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করে গেজেটের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক (বর্তমানে কারাবন্দি)। এ সময় তৎকালীন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে সব গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের ৯৩ শতাংশ হবে মেধার ভিত্তিতে। বাকি পদের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা রাখা হয়। তবে নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সেই পদও সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা হবে।

সরকারের পতন

কিন্তু ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রূপ নেয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে যান শেখ হাসিনা। ভেঙে দেওয়া হয় সংসদ। পরে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন দেয়। নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে।