আবারও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। রোববার (৩১ মে) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা করে বৃদ্ধি পাবে। নতুন মূল্য সোমবার (১ জুন) থেকে কার্যকর হবে (ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে)। জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থায় এই দাম বাড়ানো হয়েছে।
এই নিয়ে সরকার দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করলো। এর আগে এপ্রিল মাসে সরকার জ্বালানি তেলে বড় ধরনের মূল্য বৃদ্ধি করে। তখন অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্য যথাক্রমে ২০, ১৯ ও ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এছাড়াও গত কয়েক মাসে দুই দফা বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস তেলের দামও। তবে নতুন নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল ১১৫ টাকা লিটারেই থাকছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে গেলে তার সঙ্গে তাল মেলাতে দেশেও গত এপ্রিলের মাঝামাঝি দাম বাড়ানো হয়। এরপর মে মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। জুন মাসে তা আরও এক দফা বাড়ল। এই মূল্য বৃদ্ধি জনগণের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে দেশের প্রায় বিভিন্ন খাতে প্রভাব ফেলবে।
ব্যক্তিগত পরিবহন খরচ বৃদ্ধি
অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহারকারীদের ওপর। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের প্রধান জ্বালানি হলো পেট্রোল বা অকটেন। ফলে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত, স্কুলে আনা-নেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত কাজে গাড়ি ব্যবহারকারীদের মাসিক জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাবে। বিশেষ করে যেসব পরিবার নিয়মিত ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের পারিবারিক বাজেটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
রাইড-শেয়ারিং ও ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা
ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকায় বাস বা পণ্যবাহী ট্রাকের খরচের তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন হবে না। তবে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ার ফলে মোটরসাইকেল ও গাড়ি ভিত্তিক রাইড-শেয়ারিং সেবা বা যাত্রী পরিবহনের খরচ বেড়ে যেতে পারে। চালকদের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তারা ভাড়া সমন্বয়ের দাবি তুলতে পারেন। সেক্ষেত্রে যাত্রীদের বেশি ভাড়া গুনতে হবে। যদিও এর মাত্রা নির্ভর করবে বাজার পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্টদের ওপর।
সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ
বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিবহনব্যবস্থায় ডিজেলের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি হলেও পেট্রোল ও অকটেননির্ভর পরিবহনও বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়। ছোট আকারের পণ্য পরিবহন, খুচরা সরবরাহ কিংবা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত কিছু যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের কিছু অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
কৃষি খাতে প্রভাব
বাংলাদেশে সেচযন্ত্র, ট্রাক্টর ও কৃষিকাজের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি ডিজেলচালিত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয়ে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে কৃষিপণ্য সংগ্রহ, বাজারজাতকরণ বা স্থানীয় পর্যায়ে পরিবহনের ক্ষেত্রে পেট্রোলচালিত যান ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিবহন খরচ বাড়লে বিপণন পর্যায়ে তার প্রভাব পড়বে।
কেরোসিননির্ভর মানুষের বাড়তি ব্যয়
রান্না বা অন্যান্য গৃহস্থালি প্রয়োজনে যারা কেরোসিন ব্যবহার করেন তারা এর দাম বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন। এছাড়াও আমাদের দেশে বিদ্যুৎ সুবিধা সীমিত বা অনিয়মিত এমন প্রত্যন্ত এলাকায় কেরোসিন নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। তাদের মাসিক জ্বালানি ব্যয় সরাসরি বেড়ে যাবে।
নগর জীবনে বাড়তি ব্যয়ের চাপ
এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চাপ অনুভব করবেন শহরাঞ্চলের মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী, ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক এবং রাইড-শেয়ারিং চালকরা। জ্বালানি ব্যয় বাড়ার অর্থ হলো দৈনন্দিন যাতায়াতের খরচও বৃদ্ধি পাওয়া। ফলে জীবনযাত্রার অন্যান্য খাতের ব্যয় সমন্বয় করতে অনেক পরিবারকে নতুন করে হিসাব কষতে হতে পারে।
কেন প্রভাব সীমিত থাকতে পারে
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণত মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করলেও এবার ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ দেশের গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, কৃষিযন্ত্র ও শিল্প খাতের বড় অংশ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধির প্রভাব থাকলেও তা অর্থনীতির সব খাতে একই মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। তবে ব্যক্তিগত পরিবহন ও কেরোসিননির্ভর জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এর প্রভাব সরাসরি অনুভূত হবে।