Image description

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, শরীয়তপুরের জাজিরায় ১০ বছরের এক হিন্দু ছেলে ভ্যানে করে তার মৃত মায়ের লাশ থানায় নিয়ে যাচ্ছে এবং তার মাকে সন্তানদের সামনেই ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে।

একই ভিডিও শেয়ার করে ভারতের বিজেপি নেতা তথাগত রায় লিখেছেন, “বিশ্বের সবচেয়ে অসহায় মানুষ, বাংলাদেশী হিন্দুরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমরা তাদের ওপর নির্যাতন করে, হত্যা করে, নারীদের ধর্ষণ করে, তাদের সম্পত্তি দখল করে।” 

একই দাবিতে ভিডিওটি বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছে। দেখুন ,,

দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি সাম্প্রতিক কোনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতার নয়। বরং এটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার একটি পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের পুরোনো ভিডিও। এছাড়া ভিডিওতে থাকা পরিবারটি হিন্দু নয়, মুসলিম এবং মহিলাটিকে মৃত বলা হলেও ভিডিওতে থাকা নারী জীবিত।

ভিডিওটিতে শিশুটিকে বলতে শোনা যায়, “মোর কাকারা মায়েরে মারছে। মোগো বাড়ির এহানে একটা মহিলারে এই দুই-তিন দিন আগে কোপাইয়া মাইরালাইছে, মোগো সবাইরে মাইরালাইবো কইছে। (আমার কাকারা মা’কে মেরেছে। আমাদের বাড়ির এখানে একটা মহিলারে এই দুই-তিন দিন আগে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে, আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে বলেছে।) 

অনুসন্ধানে ‘সংবাদ মাদারীপুর’ নামে একটি ফেসবুক পেইজে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর “মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দরির-চর লক্ষীপুর এলাকায় অসহায় পরিবারের উপর অত্যাচারের অভিযোগ আপন চাচার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগ দিতে আসলে অবুঝ সন্তানদের সামনেই থানার ভিতরেই লু*টি*য়ে পড়েন অসহায় মা” ক্যাপশনে একটি ভিডিও পাওয়া যায়।

ভিডিওতে শিশুটি নিজের পরিচয় দিয়ে জানায়, তার নাম রবিউল, বাবার নাম স্বপন হাওলাদার এবং মায়ের নাম সুমি বেগম। সে জানায়, গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে তার কাকা শিপন হাওলাদার ও তার ছেলে ছাব্বিরের সঙ্গে তাদের বিরোধ হয়। এ বিরোধের জেরে তার মাকে মারধর করা হয় এবং গলা টিপে ধরা হয়।

একইদিন প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওই মহিলা রাস্তার পাশে শুয়ে আছেন। তার সন্তানরা তাকে ঘিরে কান্নাকাটি করছে। শিশুটি বারবার তার কাকাদের বিরুদ্ধে মাকে মারধরের অভিযোগ করে। শিশুটিকে বলতে শোনা যায়, “মোর কাকারা মায়েরে মারছে। মোগো সবাইরে মাইরালাইবো কইছে।

পরবর্তীতে ওই পেইজে প্রকাশিত একটি ফলোআপ ভিডিওতে দেখা যায়, পরিবারটি স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিকদের সহায়তায় বিরোধের সমাধান পাওয়ার কথা জানাচ্ছে।

ওই ভিডিওতে শিশুটির মা সুমি বেগম বলেন, “আমার পারিবারিক যে সমস্যা আছিলো, তা সমাধান করছে সাংবাদিক, পুলিশ ও প্রশাসনের মাধ্যমে। আমি বিচার পাইছি।”

একই ভিডিওতে শিশুটি রবিউলও বলে, “আজকে আমরা বিচার পাইছি, আমরা অনেক খুশি।”

বিষয়টি নিশ্চিত হতে চ্যানেল এস এর কালকিনি প্রতিনিধি ইব্রাহিম সবুজের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। 

তিনি বলেন, “যে ভিডিওটি সন্তানের সামনে মাকে ধর্ষণ বলে ছড়ানো হচ্ছে, সে ভিডিওটি আমাদের এক পরিচিত সাংবাদিক করেছেন। সে সময় আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। জমির বিরোধের ঘটনাকে ভিন্ন দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে। কাছাকাছি সময়ে ওই এলাকায় হত্যার ঘটনায় ঘটেছিল। ফলে সেই শিশুটি আতঙ্কিত ছিল। তার মা অজ্ঞান হয়ে পড়লে আমরা গিয়ে তার সাথে কথা বলার সময় ভিডিওটি করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে যায়।”

উল্লেখ্য ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের কালকিনিতে ঘরে ঢুকে সৌদি প্রবাসীর স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যম এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

এ বিষয়ে কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলমও দ্য ডিসেন্টকে জানান, পারিবারিক বিরোধের ঘটনাকে ধর্ষণের দাবি দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা হচ্ছে। ওই মহিলা সে সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

অর্থাৎ, পারিবারিক জমিজমা সংক্রান্ত পুরোনো একটি বিরোধের ভিডিওকে ‘হিন্দু নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা’ দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে; যা সত্য নয়।