Image description

বিআরটি প্রকল্প নেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, বাস্তবায়ন হলে দিনে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী বিশেষ বাসে যাতায়াত করতে পারবে। যানজট, সড়কপথের সংকেত (সিগন্যাল) কিংবা অন্য কোনো বাধায় বাস আটকে থাকবে না। ১৪ বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করার পর জানা গেল, এই উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার নয়; বরং যানজট ও জনভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তাই প্রকল্পটি এখন পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রকল্পটি সম্পর্কে এমন মত দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। বুয়েটের চারজন বিশেষজ্ঞের এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। তাঁরা গত মাসে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনটি জমা দিয়েছেন।

১৪ বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করার পর জানা গেল, এই উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার নয়; বরং যানজট ও জনভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তাই প্রকল্পটি এখন পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিআরটি প্রকল্প সম্পর্কে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, প্রকল্পটি দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘সিস্টেমেটিক ব্যর্থতার’ উদাহরণ। যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহির অভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনার ত্রুটি, নকশাগত দুর্বলতা, সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি ছিল বলে মন্তব্য করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বিশেষজ্ঞ দল বিআরটি কার্যক্রম পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পটি বাতিল করার পক্ষে জোরালো মত আছে। আবার বাতিল না করে আরও কিছু টাকা খরচ করে পুরোপুরি না হলেও কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে, এমন মতও আছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে সড়ক মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে যে প্রকল্পটি এখানেই শেষ, নাকি নতুন বিনিয়োগ করা হবে। এরপর বাতিল কিংবা নতুন বিনিয়োগ-চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রিসভায় তোলা হবে।

প্রকল্পটি বাতিল করার পক্ষে জোরালো মত আছে। আবার বাতিল না করে আরও কিছু টাকা খরচ করে পুরোপুরি না হলেও কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে, এমন মতও আছে।
সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম

ঋণের টাকার অবকাঠামো যাচ্ছে ক্ষয়ে

চলছে দুর্ভোগের বিআরটি প্রকল্প। উত্তরার আজমপুর-টঙ্গীর মধ্যে উড়ালসড়কের একাংশে  যানবাহন চলছে
চলছে দুর্ভোগের বিআরটি প্রকল্প। উত্তরার আজমপুর-টঙ্গীর মধ্যে উড়ালসড়কের একাংশে যানবাহন চলছেছবি: প্রথম আলো

২৫ মে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিআরটি প্রকল্পের আওতায় সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে এর কোনোটির কাজই শেষ হয়নি। স্টেশনগুলোর কোনো কোনোটি মাটিতে, আবার কিছু আছে উড়ালপথে। বিশেষ বাস চলাচল করলে যাত্রীরা রাস্তার দুই পাশ থেকে স্টেশনে যাতে-আসতে পারে, সে জন্য রয়েছে আধুনিক পথচারী পারাপার। এগুলোতে চলন্ত সিঁড়ি, কোনো কোনোটাতে লিফটের ব্যবস্থাও আছে। উত্তরার একটি চলন্ত সিঁড়ি চালু করা হয়েছিল। তবে এখন তা অচল। অন্য স্টেশনের পাশের চলন্ত সিঁড়ির যন্ত্রপাতিতে জং ধরছে, ভেঙে পড়ছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ পথে মালামাল পরিবহন করেন কাভার্ড ভ্যানের চালক মো. সোহেল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০২২ সালে এক বৃষ্টির দিনে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পার হতে তাঁর ১০ ঘণ্টা লেগেছিল। বিআরটি প্রকল্পের কষ্ট ভোলার নয়। তিনি বলেন, এখন বিআরটি লেন দিয়ে সব যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে। প্রায়ই জট লেগে থাকে। সাইন-সংকেত নেই, কোথাও উড়াল এবং কোথাও সমতল, কিছু স্থানে বেড়া দেওয়া, সড়ক সরু। চলার সময় রাস্তা ভুল হয়।

স্টেশনগুলোর কোনো কোনোটি মাটিতে, আবার কিছু আছে উড়ালপথে। বিশেষ বাস চলাচল করলে যাত্রীরা রাস্তার দুই পাশ থেকে স্টেশনে যাতে-আসতে পারে, সে জন্য রয়েছে আধুনিক পথচারী পারাপার। এগুলোতে চলন্ত সিঁড়ি, কোনো কোনোটাতে লিফটের ব্যবস্থাও আছে। উত্তরার একটি চলন্ত সিঁড়ি চালু করা হয়েছিল। তবে এখন তা অচল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিআরটি লেন আলাদা করতে উত্তরা এলাকার কিছু স্থানে সড়কের মাঝখানে লোহার বেড়া দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও বেড়া ভেঙে মানুষ পারাপার হচ্ছে। পুরো ২০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশেই পোশাক কারখানা রয়েছে। কারখানার সামনে পাহারাদারদের লাল পতাকা হাতে যানবাহন থামিয়ে শ্রমিকদের পার হতে সহায়তা করতে দেখা গেছে।

বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত পুরো ২০ কিলোমিটার সড়কে এক ফুটের কাছাকাছি উঁচু সিমেন্টের প্রতিরোধক দিয়ে বিআরটি লেন আলাদা করা হয়েছে। প্রকল্প বাতিল করে সব ধরনের যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক করতে হলে সেগুলো ভাঙতে হবে।

১৪ বছরের প্রকল্প

 আবদুল্লাহপুর চৌরাস্তায় বিআরটি প্রকল্পের অপরিকল্পিত স্থাপনাগুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। পাশের অসমাপ্ত সরু লেন দিয়েই বর্তমানে যাত্রীদের চলাচল করতে হচ্ছে। আর উড়ালসড়কে যানজট লেগেই থাকছে
আবদুল্লাহপুর চৌরাস্তায় বিআরটি প্রকল্পের অপরিকল্পিত স্থাপনাগুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। পাশের অসমাপ্ত সরু লেন দিয়েই বর্তমানে যাত্রীদের চলাচল করতে হচ্ছে। আর উড়ালসড়কে যানজট লেগেই থাকছেফাইল ছবি: প্রথম আলো

বিশেষ ধরনের বাস চলাচলের জন্য সড়কের মাঝখান দিয়ে দুটি লেন আলাদা করার নাম হচ্ছে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি। রাজধানী ঢাকার প্রথম বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সড়কপথ, বাকিটা উড়ালপথ। ২০১২ সালে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের জন্য গত ১৪ বছরে উত্তরা, টঙ্গী ও গাজীপুর ছাড়াও বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলে যাতায়াতকারীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নকালে নির্মাণকাজের ক্রেন ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে সাতজনের।

বিআরটি প্রকল্পে শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার বাস পরিচালনার কথা ছিল। এরপর প্রকল্প প্রস্তাব তিনবার পরিবর্তন করা হয়। সময় বাড়ে, ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। কাজ শেষ হয় না, আধুনিক বাসও নামে না। খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্পটি চতুর্থবার সংশোধনের প্রস্তাব দেয়। নতুন প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। মেয়াদ ধরা হয় ২০২৯ পর্যন্ত।

প্রকল্প পর্যালোচনা

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একনেক চতুর্থ সংশোধিত ওই প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন করেনি; বরং প্রকল্পটির বিকল্প কী হতে পারে, তা আবার পরীক্ষা করার নির্দেশ দেয়। এ ছাড়া প্রকল্পের নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে করণীয় সুপারিশ করতেও বলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠক হয়। সেখানে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করা হয় এবং তারা প্রতিবেদনও দেয়।

২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে দুটি কমিটির প্রতিবেদন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হককে পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল বিআরটি প্রকল্প নিয়ে তারা আর এগোবে না। এখন প্রকল্পটি চালিয়ে নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বিএনপি সরকার। এমনকি জাতীয় সংসদের মতামত নেওয়ার কথা বলছেন কেউ কেউ।

অবশ্য বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মনে করছে, অবকাঠামোগত কাজের মাত্র ৩ শতাংশ বাকি থাকা অবস্থায় প্রকল্পটি বাতিল করা ঠিক হবে না। ভাঙতে গেলেও স্টেশন, র‍্যাম্প ও এস্কেলেটর অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।

গত ১৮ মে রাজধানীর বিআইপি কনফারেন্স হলে আয়োজিত ‘গণপরিবহননির্ভর নগর: ঢাকা-গাজীপুর বিআরটির ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এমন মত তুলে ধরা হয়।

বিআরটি একটি চাপানো প্রকল্প ছিল। নকশায় ত্রুটি, সম্ভাব্যতা যাচাই ঠিক ছিল না। কিন্তু এগুলো সওজ, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরামর্শক, এমনকি পরিকল্পনা কমিশনও ধরেনি। এটা খুবই বাজে দৃষ্টান্ত হলো।
অধ্যাপক সামছুল হক, বুয়েট

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এখন প্রকল্পটি বন্ধ করা হলে ঋণ করে যে টাকা খরচ করা হয়েছে, তা অনেকটাই পানিতে যাবে। সব যানবাহনের জন্য উন্মুক্ত করতে গেলে আরও কয়েক শ কোটি টাকা খরচ করে অবকাঠামো ভাঙতে হবে। নতুন করে আরও সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে বাস কিনে চালাতে গেলে সেটিও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রকল্পটি একটি গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।

মূলত বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পাশাপাশি এতে অর্থায়ন করছে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)।

বিআরটি প্রকল্পে বাস কিনে চালানোর জন্য ২০১৩ সালে ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিবিআরটিসিএল) গঠন করা হয়। এই কোম্পানিতে এখন ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই এসেছেন সরকারের অন্য দপ্তর থেকে। বাস কেনা হয়নি বলে তাঁদের তেমন কোনো কাজ নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা হওয়ার আগেই প্রকল্প নেওয়া হয়। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা সমস্যা তৈরি হয়। যেমন নির্মাণকাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে যাচ্ছে। সেবা সংস্থার লাইন কীভাবে সরানো হবে, তা-ও আগে থেকে ঠিক করা হয়নি। ব্যস্ততম সড়কে নির্মাণকাজের সময় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিকল্প চিন্তাও করা হয়নি।

নকশায় ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা

গ্লোবাল বিআরটি ডাটা নামে একটি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে। এসব বিআরটিতে প্রতিদিন সোয়া তিন কোটি যাত্রী যাতায়াত করে। ১৩টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু আছে পাশের দেশ ভারতে। দেশটির ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব বিআরটি ব্যবস্থায় প্রতিদিন যাত্রী পরিবহন করে প্রায় পাঁচ লাখ। চীনে বিআরটিতে চলে প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে চলাচল করে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী।

২০০৫ সালে ঢাকার জন্য কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) নিয়েছিল সরকার। সেখানেই মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক ও বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির পাশাপাশি ঢাকায় বিআরটি চালুর সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পথটি এসটিপিতে ছিল না। ২০১১ সালে এডিবি তাদের নিয়োগ করা পরামর্শকদের মাধ্যমে এই পথকে বিআরটির জন্য উপযোগী হিসেবে প্রস্তাব করে।

বিআরটি প্রকল্পের উড়ালসড়কের নিচের অংশের অবস্থাও বেহাল
বিআরটি প্রকল্পের উড়ালসড়কের নিচের অংশের অবস্থাও বেহালছবি: দীপু মালাকার

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা হওয়ার আগেই প্রকল্প নেওয়া হয়। বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা সমস্যা তৈরি হয়। যেমন নির্মাণকাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে যাচ্ছে। সেবা সংস্থার লাইন কীভাবে সরানো হবে, তা-ও আগে থেকে ঠিক করা হয়নি। ব্যস্ততম সড়কে নির্মাণকাজের সময় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিকল্প চিন্তাও করা হয়নি।

২০১৯ সালে বিআরটি প্রকল্প থেকে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টঙ্গী কলেজ গেট থেকে ভোগরা বাইপাস পর্যন্ত অংশে দিনে গড়ে ২৪ হাজার ৭৫৪টি যানবাহন চলাচল করে। ২০২২ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক সমীক্ষায় এসেছে, আবদুল্লাহপুর হয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার যানবাহন চলাচল করে।

নকশা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বুয়েট। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআরটি স্টেশন এলাকার কাছে সড়ক সরু হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় পদচারী-সেতু থেকে নামার অংশ ফুটপাত দখল করে ফেলেছে। আবদুল্লাহপুর, ভোগরা ও গাজীপুর চৌরাস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন নকশা করা হয়েছে, সেখানে ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিবহন অবকাঠামো করা যাবে না।

অনেক পদচারী–সেতুর অবকাঠামো এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে
অনেক পদচারী–সেতুর অবকাঠামো এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছেছবি: দীপু মালাকার

ভজকটের এক প্রকল্প

বিআরটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকারের তিনটি সংস্থা, যার সমন্বয়ও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রকল্পের মূল কাজটি করছে। বিআরটি পরিচালনা করার জন্য গঠিত হয়েছে সরকারি কোম্পানি ডিবিআরটিসিএল। প্রকল্প সমন্বয়ের দায়িত্বে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) একটি কমিটি। এর বাইরে কাজ তদারকিতে নিয়োজিত ছিল চারটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

সওজের দায়িত্ব ছিল ১৬ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ, বিআরটি লেন নির্মাণ, ছয়টি ছোট উড়ালসড়ক, ২৫টি বিআরটি স্টেশন নির্মাণ। সাড়ে চার কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মাণ, এর মধ্যে বিআরটি লেন তৈরি, স্টেশন নির্মাণ এবং বিদ্যমান টঙ্গী সেতুর জায়গায় ১০ লেনের একটি নতুন সেতু নির্মাণের দায়িত্ব সেতু বিভাগের। এলজিইডির ভাগে ছিল সার্ভিস লেন ও গাজীপুরে একটি বাস ডিপো নির্মাণ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি এবং সড়কবাতি বসানো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে দেশে যেসব বিআরটি প্রকল্প হচ্ছে, এর বেশির ভাগই ১২ থেকে ১৪ লেনের সড়কে হচ্ছে। আর গাজীপুরে সড়ক চার লেন, বিমানবন্দরে ছয় লেনের। এই সড়কের মাঝখানে দুটি লেন আলাদা করা কঠিন। এ ছাড়া কোথাও উড়ালপথে, আবার কোথাও মাটিতে বিআরটির পথ করার ধারণাটিও ভুল। এ ধরনের সড়কে বিআরটির পুরোটা উড়ালপথে করা দরকার ছিল।

প্রকল্প-সংক্রান্ত নথি অনুসারে, উড়ালপথ ও সড়ক নির্মাণের দায়িত্ব পালন করছে তিনটি চীনা কোম্পানি। আর গাজীপুরে ডিপো নির্মাণের দায়িত্বে দেশীয় কোম্পানি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে দেশে যেসব বিআরটি প্রকল্প হচ্ছে, এর বেশির ভাগই ১২ থেকে ১৪ লেনের সড়কে হচ্ছে। আর গাজীপুরে সড়ক চার লেন, বিমানবন্দরে ছয় লেনের। এই সড়কের মাঝখানে দুটি লেন আলাদা করা কঠিন। এ ছাড়া কোথাও উড়ালপথে, আবার কোথাও মাটিতে বিআরটির পথ করার ধারণাটিও ভুল। এ ধরনের সড়কে বিআরটির পুরোটা উড়ালপথে করা দরকার ছিল।

গাজীপুর অংশে বিআরটি প্রকল্পের অধিকাংশ পদচারী–সেতুই এখনো ব্যবহারের অনুপযোগী
গাজীপুর অংশে বিআরটি প্রকল্পের অধিকাংশ পদচারী–সেতুই এখনো ব্যবহারের অনুপযোগীছবি: দীপু মালাকার

দায়ী কারা

বুয়েটের প্রতিবেদনে কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়নি। তবে তারা বলেছে, প্রকল্পটি ব্যর্থ হওয়ার পেছনে দায়ীদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তারা। তাঁদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। এ ছাড়া অর্থায়নকারী সংস্থা, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, সরকারের বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনকেও দায়ী করা হয়েছে।

বুয়েটের প্রতিবেদনে ১৭টি সুপারিশ রয়েছে। এর মধ্যে কমিউটার ট্রেনের ওপর জোর দেওয়া, অসমাপ্ত পদচারী-সেতু দ্রুত শেষ করা, শ্রমিক ও পথচারীর চাহিদা অনুযায়ী নতুন পদচারী-সেতু নির্মাণ করা। বিআরটি স্টেশনের লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি অন্য সরকারি স্থাপনায় স্থানান্তর অথবা নিলামে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বিআরটি একটি চাপানো প্রকল্প ছিল। নকশায় ত্রুটি, সম্ভাব্যতা যাচাই ঠিক ছিল না। কিন্তু এসব অসংগতি বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরামর্শক, এমনকি পরিকল্পনা কমিশনও ধরেনি। এটা খুবই বাজে দৃষ্টান্ত হলো।

এই অধ্যাপক আরও বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাংলাদেশে প্রথম। ফলে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকতেই পারে। কিন্তু পৃথিবীতে তো অভিজ্ঞ মানুষ ছিল। তাদের এনে করা যেত। এই অপরিপক্ব ও চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্প এক যুগ ধরে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলেছে। টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু জনগণকে যে উপকারের কথা বলা হয়েছিল, এর কিছুই পায়নি। এটা ভবিষ্যতের জন্য একটা শিক্ষা হিসেবে নিতে হবে। একই ভুল যাতে আবার না হয়।