Image description

প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে অসাধু চামড়া সিন্ডিকেটের কারসাজিতে প্রান্তিক, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও এতিমখানাগুলো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। এবারও সেই পুরোনো সংকট দেখা গেছে। চক্রটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পানির দরে কাঁচা চামড়া কিনতে বাধ্য করায় অনেক ব্যবসায়ী মূলধন হারিয়ে পথে বসেছেন।

প্রান্তিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চামড়াশিল্পে সিন্ডিকেটের থাবা একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট। অসাধু ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী ও ট্যানারি মালিকদের একটি চক্র কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে মাঠপর্যায়ের সংগ্রাহক, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং মাদ্রাসা ও এতিমদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে আসছে। 

এবারও সরকারি দামে বিক্রি হয়নি চামড়া

সরকার প্রতি বছর চামড়ার দাম বেঁধে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনও প্রতিফলন দেখা যায় না। আড়তদার সিন্ডিকেটের কারসাজিতে কোরবানিদাতা বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক কম দামে (কখনও কখনও চামড়া প্রতি ১০০ থেকে ৩০০ টাকা) চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন।

প্রান্তিক পর্যায়ে কৃত্রিম ক্রেতা

 

কোরবানির ঈদের দিন ও পরের দিনগুলোতে আড়তদাররা রহস্যজনকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকেন। বাজারে ক্রেতার এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তারা দাম একেবারেই তলানিতে নামিয়ে আনেন। উপায়ান্তর না দেখে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসানে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন।

এতিম ও দুস্থদের হক নষ্ট

চামড়া বিক্রির একটি বড় অংশের আয় এতিমখানাগুলোর ফান্ডে জমা হয়। সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। 

এ ছাড়া কাঁচা চামড়া পাচারের ঝুঁকি আছে। সিন্ডিকেটের কারণে দেশের বাজারে দাম অস্বাভাবিক কমে গেলে একশ্রেণির অসাধু চক্র সুযোগ নেয়। তারা তখন চোরাই পথে বা অন্য উপায়ে কাঁচা চামড়া সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বিদেশে পাচারের সুযোগ খোঁজে। 

পুঁজি হারিয়েছেন হাজারো মৌসুমি ব্যবসায়ী

রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. রফিক। পেশায় পিকআপ চালক মো. রফিক প্রতি বছর কোরবানিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাঁচা চামড়া কিনে থাকেন। এবারও কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে সরাসরি ২০০ পিস কাঁচা চামড়া কিনেছেন। ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায় কেনা ছোট-বড় এসব চামড়া  আতুরার ডিপো আড়তে বিক্রি করেন ২০০ টাকা দরে। 

মো. রফিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবার চামড়া কিনে ১৫ হাজার টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। কোরবানির দিন বিকাল ৪টার মধ্যে চামড়া কিনে আড়তে যাই। বেশ কয়েকটি আড়তে ঘুরেছি। কেউ চামড়া কিনতে রাজি হননি। শেষমেশ একজন আড়তদার ২০০ টাকা প্রতি পিসে এসব চামড়া কিনেছেন ঠিকই। তবে ছোট চামড়াগুলো তিনি কেনেননি। ১০০ চামড়ার মধ্যে অন্তত ২০টি করে ছোট চামড়া বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০০ পিস চামড়ার মধ্যে ৪০ পিস বাদ দিয়ে ১৬০টির টাকা পেয়েছি। বাকি সব লোকসান হয়েছে আমার।’

নজরুল ইসলাম নামের আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর আশা করেছিলাম চামড়ার দাম বাড়বে। কিন্তু এখনও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। অব্যবস্থাপনার কারণে কাঁচা চামড়া প্রায় মূল্যহীন হয়ে গেছে। গত বছরের চেয়েও এবার দাম কমে গেছে। পানির দামে বিক্রি করতে হয়েছে।’

চামড়ায় সিন্ডিকেটের থাবা

একাধিক মৌসুমি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে এবারও কাঁচা চামড়ার প্রকৃত দাম মেলেনি। এজন্য হাজারো ব্যবসায়ী পুঁজি হারিয়েছে পথে বসেছেন। পাশাপাশি অসংখ্য চামড়া নষ্ট হয়েছে। নজরুল ইসলাম নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আড়তদার সিন্ডিকেটের কারণে এবারও চামড়ার প্রকৃত দাম মেলেনি। শুরু থেকে আড়তদাররা চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাননি। এটা ছিল তাদের কৌশল। ট্রাকে ট্রাকে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আনা চামড়া নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ঘুরতে হয়েছে এক আড়ত থেকে অন্য আড়তে। শেষ পর্যন্ত কেউ কম দামে বিক্রি করেছেন। আবার কেউ বিক্রি করতে না পেরে এসব চামড়া সড়কের পাশে ফেলে গেছেন।’ 

চামড়া সংগ্রহ করেছে গাড়সিয়া কমিটি

চট্টগ্রামের উপজেলা ও নগরের বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছেন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের কয়েক হাজার কর্মী। সংগঠনটি নগরে ৩৫ হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছে। এসব চামড়া মুরাদপুর জামেয়া মাদ্রাসা মাঠে এবং হালিশহর এলাকায় অপর একটি মাদ্রাসায় মাঠে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। এ ছাড়া উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে পৃথকভবে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছেন গাউসিয়া কমিটির সদস্যরা।

এ প্রসঙ্গে গাউসিয়া কমিটির মুখপাত্র মো. মোসাহেব উদ্দিন বখতেয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরের  বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গিয়ে আমাদের স্বেচ্ছাসেবীরা চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এ ছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে আলাদা করে চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আগের বারের মতো মোহাম্মদ আলী নামে এক আড়তদার আমাদের কাছ থেকে মহানগরীতে সংগ্রহ করা চামড়াগুলো কিনে নিয়েছেন। বিভিন্ন উপজেলায় সংগ্রহ করা চামড়াগুলো আমরা সেখানে বিক্রি করেছি। কারণ সেগুলো শহরে আনতে সময় লাগবে। আবার নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি হলে আড়তদার কিনছেন না। তবে গত বছরের চেয়ে এবার চামড়া কম মূল্যে বিক্রি হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে সংগ্রহ করা অনেক চামড়ার পিস ১০০ টাকা করেও বিক্রি করতে পারিনি। চামড়া নিয়ে সরকারের আগাম পরিকল্পনা থাকা উচিত। এই খাতকে বাঁচাতে হলে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের মতো চামড়া সংগ্রহ করতে হবে।’ 

চামড়ার দাম কেন কম

এক দশক আগে যে চামড়া দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হতো, একই চামড়া এবার বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকায়। তবে চামড়ার দাম কমলেও বেড়েছে চামড়াজাত পণ্যের। 

এ প্রসঙ্গে কাঁচা চামড়ার আড়তদার বয়বসায়ী সমিতির সদস্য লেদু মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোরবানিতে বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ হয়। তবে দেশে চামড়াজাত পণ্যের বিকাশে এখনও পর্যাপ্ত শিল্প কারখানা গড়ে উঠেনি। দেশে চামড়ার এত বেশি চাহিদা না থাকায় এমনটাই হচ্ছে। এজন্য সরকার চাইলে বিদেশে চামড়া রফতানির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।’

মোস্তাফিজুর রহমান নামে আরেক আড়তদার বলেন, ‘একসময় চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি ছিল। পর্যায়ক্রমে এসব ট্যানারি একে একে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি মাত্র ট্যানারি সচল আছে। একটি ট্যানারি প্রতি বছর চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে কোরবানিতে এক লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করে থাকে। ট্যানারি বেশি থাকলে লবণজাত চামড়া বিক্রিতে সমস্যা হতো না। মূলত ট্যানারি কমে যাওয়ায় চামড়ার কেনায় কারও আগ্রহ নেই।’ 

একই কথা বলেছেন আবু তাহের নামে আরেক আড়তদার। তিনি বলেন, ‘কোরবানির দিন একসঙ্গে জেলা ও উপজেলার পাশাপাশি তিন পার্বত্য জেলা থেকেও চামড়া আসে চট্টগ্রামের আড়তে। যে পরিমাণ চামড়া আড়তগুলোতে আসে এত বেশি চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও জনবল, লবণ ও চামড়া সংরক্ষণে রাখার গুদামের বিষয়টি মাথায় রেখে আড়তদাররা চামড়া সংগ্রহ করে থাকেন। তাই কোরবানির দিন জেলা-উপজেলার চামড়া নগরে না এলে চামড়ার দাম বাড়তো এবং কোনও চামড়া নষ্ট হতো না। বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আগাম প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।’ 

আতুরার ডিপো এলাকার বিভিন্ন আড়ত ঘুরে দেখা যায়, ছোট-মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকায়। বড় আকারের চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়।

অথচ গ্রামের বাসাবাড়ি থেকে এসব চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বড় চামড়ার জন্য ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। ফলে প্রতি চামড়ায় গুনতে হয়েছে লোকসান।

সাধারণত ১২ থেকে ১৬ বর্গফুটের চামড়াকে ছোট আকার হিসেবে ধরা হয়। ১৭ থেকে ২২ বর্গফুট মাঝারি এবং ২৩ বর্গফুটের বেশি হলে সেটিকে বড় চামড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সাইজ অনুযায়ী দাম বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা মেলেনি বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়ার আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘চামড়া কিনে পরিষ্কার করা, লবণ দেওয়া ও কারখানায় পাঠানো পর্যন্ত অনেক খরচ। একটি চামড়া কারখানায় পৌঁছাতে প্রায় ৪৫০ টাকা খরচ পড়ে। তাই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে দামে চামড়া কিনেছেন, সে দামে আমাদের পক্ষে কেনা সম্ভব হয়নি। আবার ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় আমরা চাপের মধ্যে আছি। পুরো চামড়া খাতে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এজন্য প্রতি বছর একই সংকট দেখা যাচ্ছে।’

কয়েক ট্রাক চামড়া ফেলে গেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা 

কোরবানির পরদিন থেকে চট্টগ্রাম নগরের যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে কাঁচা চামড়া। নগরের আতুরার ডিপো, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন সড়ক-ফুটপাতে ট্রাকে ট্রাকে বিভিন্ন উপজেলাসহ নগরের বিভিন্ন স্থান থেকে আনা অবিক্রীত কাঁচা চামড়া যত্রতত্র ফেলে গেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। পড়ে থাকা এসব চামড়া শুক্রবার সকাল থেকে পরিষ্কার করেছেন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার কাঁচা চামড়ার ঠাঁই হয়েছে সিটি করপোরেশনের ময়লার স্তূপে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘কোরবানির পরদিন নগরের বিভিন্ন স্থানে কাঁচা চামড়া পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অক্সিজেন আতুরার ডিপো এলাকায় বেশ কয়েক ট্রাক অবিক্রীত কাঁচা চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ফেলে গেছেন। এ ছাড়াও নগরের চৌমুহনীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে চামড়া যত্রতত্র ফেলে গেছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সেগুলো পরিষ্কার করে ময়লার স্তূপে নিয়ে গেছেন।’