পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক মো. তানভীর হোসেন। ঈদের দিন বিকালে ঢাকা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে নানার বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচংয়ে রওনা হয়েছিলেন। বাড়ি পৌঁছানোর কিছুদূর আগেই পেছন থেকে একটি অটোরিকশার ধাক্কায় বাইক উল্টে পড়ে যান তিনি। দুর্ঘটনায় তার ডান পায়ের হাড় পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ডান হাতেও গুরুতর জখম হয়েছে। এছাড়া মাথা ও পেটে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন।
পরে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখান থেকে ওই দিন রাতে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর থেকেই হাসপাতালের ওয়ার্ডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন তিনি।
তার পাশেই বসে ভাই রাহুল হোসেন সান্ত্বনা দিচ্ছেন তানভীরকে। তিনি আমার দেশকে বলেন, দুর্ঘটনায় এবার আমাদের পুরো ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে গেছে। চিকিৎসক জানিয়েছেন, রোগীর পায়ের অবস্থা ভালো নয়। হয়তো কেটে ফেলতে হবে। তাহলে তো আমার ভাই সারা জীবনের পঙ্গু হয়ে যাবে। এটা তো মেনে নেওয়া অনেক কষ্টকর।
গতকাল রোববার সকালে টাঙ্গাইলের সখিপুরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সিএনজির ধাক্কায় হাত-পা ভাঙা অবস্থায় হিমেল মিয়া (১৭) নামের এক তরুণকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা।
শুধু তানভীর ও হিমেলই নয়, ঈদের আগে বা পরে গত ছয়দিনে তরুণ থেকে বয়স্ক সব বয়সি মানুষ এসেছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কিংবা নানা ধরনের আঘাত পেয়ে আহত হয়ে। কারো হাত ভাঙা, কারো পা। আবার কারো মাথাসহ পুরো শরীরে ব্যান্ডেজ। আহতদের কেউ কেউ সিএনজি, অটোরিকশা, গাড়ি দুর্ঘটনায় বা অন্য কোনো কারণে ছোটখাটো আঘাত নিয়ে এসেছেন। কোনো কোনো রোগীর হাত-পা কেটে ফেলার মতো অবস্থাও রয়েছে। আহতদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ। এছাড়া আহতদের কেউ কেউ আবার এসেছেন কোরবানির পশু নিয়ন্ত্রণ ও জবাই করতে গিয়ে গরুর লাথি ও গুঁতায় আহত হয়ে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের আগে ও পরে গত ছয়দিনে বিভিন্ন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এক হাজার ৮৯৪ জন রোগী জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। যা দৈনিক গড়ে ৩১৬ জন। এই সময়ে গড়ে প্রতি সাড়ে চার মিনিটে একজন করে রোগী চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছেন।
এছাড়া গত ছয়দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৯৭ জন। আর কোরবানির পশু নিয়ন্ত্রণ ও জবাই করতে গিয়ে গরুর লাথি ও গুঁতায় আহত হয়ে সেবা নিয়েছে ২৩৯ জন। যা মোট রোগীর ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ। আর ১৯৫ জন বা ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ রোগী মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
গতকাল রোববার সরেজমিনে পঙ্গু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের ছুটি শেষ হলেও জরুরি বিভাগে ঘণ্টায় ঘণ্টায় এমন অসংখ্য রোগী আসছেন। এছাড়া আহত রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে পা ফেলার মতো কোনো জায়গা নেই। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে এক্স-রে রুম, টিকিট কাটার রুম, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ডাক্তারের রুমের সামনেও দীর্ঘ লাইন। যাদের অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন।
হাসপাতালের ক্যাজুয়াল ব্লকের কোনো শয্যা খালি নেই। আবার শয্যা না পেয়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতে থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে রোগীদের। তাদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা।
জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, নির্ধারিত ১০ শয্যার মধ্যে কোনোটাই খালি নেই। একটু পরপর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগীরা আসছেন। কিন্তু রোগীর চাপে সেখানে স্থান সংকুলান হচ্ছে না। বেশ কয়েকজন রোগীকে ট্রলিতেই রাখা হয়েছে।
জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক আলমগীর শিকদার আমার দেশকে বলেন, ঈদের সময়ে প্রতি বছরই বিভিন্ন দুর্ঘটনায় রোগীর চাপ বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রোগীর আঘাতের ধরন অনুযায়ী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অন্যদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের নির্দিষ্ট সময় পরপর ফলোআপে আসতে বলা হচ্ছে।
ঈদের সময়ে দুর্ঘটনায় বিষয়ে নিটোরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী সময়ে সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এই ছুটির সময়ে ছোট-বড় ৪০০-এর বেশি অপারেশন করতে হয়েছে। প্রতি শিফটে ২৪ জন করে ডাক্তার দায়িত্ব পালন করছেন। জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আরো চিকিৎসক যোগ দেবেন।
সাধারণত ঈদের ছুটিতে রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় অনেক চালক বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালান। এর সঙ্গে অদক্ষ চালনা, অতিরিক্ত আরোহী বহন, প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব এবং মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে। আহতদের অধিকাংশই তরুণ বয়সি। তাদের মধ্যে অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাই তরুণদের সতর্কতার সঙ্গে মোটরসাইকেল চালানোর এবং বেপরোয়া গতি পরিহার করার আহ্বান জানান এই চিকিৎসক।