Image description

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি যখন মূলত ভারত ও সোভিয়েতকেন্দ্রিক বলয়ে আবদ্ধ ছিল, তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের কূটনীতিতে আনেন নতুন মোড়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় এসে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে বহুমুখী, অর্থনৈতিক স্বার্থনির্ভর এবং মুসলিম বিশ্বমুখী কাঠামোয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাংলাদেশের ‘ব্যালান্সিং ডিপ্লোম্যাসি’ বা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ভিত্তি অনেকাংশে জিয়ার সময়েই তৈরি হয়।

 

রাষ্ট্রপতি জিয়ার কূটনৈতিক দর্শনের মূল বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’।

জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আদর্শভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির বদলে বাস্তব অর্থনীতি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেন তিনি।

 

ভারত-সোভিয়েত বলয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সময় বাংলাদেশের কূটনীতি ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছিল।

জিয়াউর রহমান সেই একমুখী অবস্থান থেকে বের হয়ে বহুপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

 

তার সরকারের সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ে।

মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠিত হয়। একই সঙ্গে জোরদার হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগও।

 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও বাংলাদেশকে একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন জিয়া।

মুসলিম বিশ্বের দিকে ঝোঁক
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা। বিশেষ করে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসির সঙ্গে বাংলাদেশের সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য।

তার আমলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত উন্নত হয়। উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমবাজার সম্প্রসারিত হয়। আরব বিশ্বে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে।

কূটনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে জিয়ার কূটনৈতিক উদ্যোগ বড় ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে এই শ্রমবাজার বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সূচনা
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে খুব বেশি গতি আসেনি। তবে জিয়াউর রহমানের সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠে। তার আমলে চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শুরু হয়। অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ে এবং কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তার ভিত্তি ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে স্থাপিত হয়েছিল বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
জিয়াউর রহমানের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের কাছে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি।

তার সরকার বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং পশ্চিমা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ায়।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিদেশি সহায়তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে জিয়া বাস্তববাদী অবস্থান নেন।

সার্ক ধারণার অন্যতম উদ্যোক্তা
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা সামনে আনার ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। পরে সেই উদ্যোগ থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক।

যদিও ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার আগেই তিনি নিহত হন, তবু তাকে সংগঠনটির অন্যতম ধারণাদাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

কূটনীতিতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। তার পররাষ্ট্রনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। এর মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় ও ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। একই সঙ্গে ভারতের প্রভাব থেকে কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরির চেষ্টাও করেন।

এই নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত হয়।

প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে পরিবর্তন
জিয়াউর রহমানের সময় প্রতিরক্ষা কূটনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ বাড়ে। সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন শুরু হয় এবং বহুমুখী সামরিক সহযোগিতা গড়ে ওঠে।

চীনা সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তখন থেকেই গুরুত্ব পেতে শুরু করে।

জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য
বাংলাদেশ ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হয়। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে অনুন্নত দেশগুলোর প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে এবং কম দামে তেল সরবরাহ করার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেয়। পরবর্তীতে উত্তর ও দক্ষিণের পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়ে ব্রান্ট কমিশনের ফলাফল সামনে তুলে ধরে।

কূটনৈতিক উত্তরাধিকার
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আজকের বাংলাদেশের ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ বা বহুমুখী কূটনীতির প্রাথমিক কাঠামো জিয়াউর রহমানের সময়েই দৃশ্যমান হয়। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, মুসলিম বিশ্ব ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার যে কৌশল বর্তমানে বাংলাদেশ অনুসরণ করছে, তার ঐতিহাসিক শেকড় অনেকটাই জিয়াউর রহমানের সময়ের কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসে নিহিত।

জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেছেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও কূটনৈতিক দিকনির্দেশনায় বড় পরিবর্তন আনেন।

জিয়া ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করেন। পররাষ্ট্রনীতিতে আদর্শিক অবস্থানের বদলে বাস্তববাদী অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেন।

রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক তালুকদার মানিরুজ্জামান গবেষণায় উল্লেখ করেন, জিয়ার আমলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী কূটনীতি’র দিকে অগ্রসর হয়। তার মতে, জিয়া চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক তৈরি করেন। বাংলাদেশের কূটনীতিকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাস্তবতায় নতুনভাবে স্থাপন করেন। এছাড়া সার্ক ধারণা তার অন্যতম বড় কূটনৈতিক অবদান।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দেন। তবে তার সময় থেকেই বাংলাদেশে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির নতুন মাত্রা তৈরি হয়, যা পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রতিফলিত হয়।