Image description

ঈদের দিন রাত ৯টার পর কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ২০০ গজ দূরে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যেতে রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় বেশ কিছু কাঁচা চামড়া। স্তূপ আকারে পড়ে আছে চামড়াগুলো।

চারপাশে কোনো লোকজন নেই। আশপাশের চায়ের দোকানদার বা পথচারী কেউই কিছু বলতে পারেননি।

 

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চামড়াগুলোর কোনো মালিক পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, দাম না পাওয়ায় কোরবানির পশুর ওই চামড়াগুলো ফেলে দেওয়া হয়েছে।

 

সারা দেশ থেকে বাংলানিউজের আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে আরও বেশ কিছু স্থানে কাঁচা চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনা উঠে আসে। দাম না পেয়ে দেশের কোথাও কোথাও চামড়া পুঁতে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।

কোথাও ময়লার ভাগাড়ে স্থান পেয়েছে এসব চামড়া। কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও আবার নদীর ধারে ফেলে রাখা হয়েছে এসব চামড়া। অথচ সংরক্ষণ করে রাখতে পারলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশি মুদ্রাও আয় করা যেত।

 

বৃহস্পতিবার (২৮ মে) থেকে শুক্রবার (২৯ মে) দুপুর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া তথ্য ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

ঢাকার মধ্যে কাজীপাড়ার রাস্তার পাশে স্তূপ আকারে চামড়া ফেলে রাখার কারণ জানা যায়নি। আশপাশের কেউ বলতে পারছিলেন না চামড়াগুলো কার বা কাদের। পাশের এক টং দোকানের চায়ের দোকানদার জানান, তিনি অনেকক্ষণ ধরেই চামড়াগুলো সেখানে পড়ে থাকতে দেখছেন।

পথচারীকে জিজ্ঞেস করলে তারাও কেউ কিছু বলতে পারেননি।

ঢাকার মাদরাসা, এতিমখানা ও মৌসুমি সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের কোনো মিল নেই।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া ও নগদ অর্থসংকটের কারণেই বাজারে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

কোথাও রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে গরু ও ছাগলের চামড়া। ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরদাম আর হাঁকডাকে পুরো এলাকা সরগরম থাকলেও বিক্রেতাদের মুখে ছিল হতাশার ছাপ।

পোস্তায় বড় গরুর চামড়া বিক্রি করতে আসা কয়েকজন জানান, একটি ভালো মানের বড় চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা বলা হচ্ছে। কোথাও সামান্য কাটা বা ছিদ্র থাকলে দাম নেমে যাচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়। এক ধরনের সিন্ডিকেট করে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা শত শত গরুর চামড়া সংগ্রহ করছিলেন। সবারই আশা ছিল, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়বে। কিন্তু সেই আশা শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। কেউ চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে চলে যান। কেউ নামমাত্র দামে বিক্রি করেন। কেউ আবার আড়তে চামড়া রেখে চলে আসেন।

সাতক্ষীরা জেলার অনেকেই পশুর চামড়া বিক্রি না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবেই চামড়া বিক্রি করতে না পেরে লোকসান ও দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচতে জেলার বিভিন্ন স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শুক্রবার সকালে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন থেকে আনা বেশ কিছু চামড়া বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর খেয়াঘাট এলাকায় খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে স্তূপাকারে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এবার ব্যাপক ধস নেমেছে। কোরবানির পর দুপুর থেকেই উপজেলার সদরসহ বিভিন্ন গ্রামে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ শুরু করলেও ক্রেতার সংখ্যা ছিল খুবই কম।

কোথাও কোথাও চামড়া কিনতে কোনো ব্যবসায়ীই যাননি। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে চামড়া উপজেলা সদরে নিয়ে আসেন। কিন্তু সেখানেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে কেউ কেউ চামড়া ফেলে রেখে চলে গেছেন। আবার অনেকে স্থানীয় মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে চামড়া দান করে দিয়েছেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর সরবরাহ বেশি ছিল। চাহিদা ছিল এক কোটি এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশুর। কোরবানিযোগ্য পশু ছিল এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী ছিল।

এ বছর গরুর কাঁচা চামড়ার দর ঢাকার ভেতরে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে গরুর কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সারা দেশে খাসির চামড়ার প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

তবে সেই অনুপাতে দাম পাননি চামড়া বিক্রেতারা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে লালবাগের পোস্তায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিকেল ৩টার পর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে কোরবানির চামড়া আসতে থাকে।

আড়তদারদের হাঁকডাকে সরব হয়ে ওঠে লালবাগের শায়েস্তা খান, রাজ নারায়ণ ধর রোডসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়ক। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ শুরু করেন।

তখনও পুরোদমে শুরু হয়নি কাঁচা চামড়ার বেচাকেনা। রাতের দিকে বেচাকেনা কমে যায়।

পোস্তায় ঈদের দিন প্রথম দিকে বড় আকারের প্রতিটি চামড়া ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হয় এবং মাঝারি আকারের চামড়াগুলো ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়া ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে কিছু ব্যবসায়ী গড়ে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকায় কেনেন। শেষ দিকে ভালো চামড়ার দাম ৫০০ টাকায় নেমে আসে। আর কাটা বা ছিদ্র হওয়া চামড়া অনেকে কিনতেই চাননি। কেউ কেউ নামমাত্র দাম দিয়েছেন।

পোস্তার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে চামড়া সংগ্রহের পর প্রথমে লবণজাত করা হয়। পরে তা সাভারের ট্যানারিগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ঢাকার আমিনবাজারের চামড়া বিক্রয়কেন্দ্র আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ঈদের দিন দুপুরে তিনি ওই বাজার পরিদর্শন করেন।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, কোরবানির মৌসুমে চামড়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

চামড়া শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

মন্ত্রী বলেন, কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেট বা চামড়ার অপচয় যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
চামড়া সংরক্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে লবণ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ প্রদাণেরও আয়োজন করা হয় বলে জানা যায়। 

তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ট্যানারি মালিকদের চামড়া কিনতে প্রতিবারের মতো এবারও ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

গত বছরের কোরবানির ঈদে কাঁচা চামড়া কিনতে ট্যানারি মালিকদের জন্য মোট ২৩২ কোটি টাকা ঋণের বরাদ্দ রেখেছিল ব্যাংকগুলো। সরকারি ও বেসরকারি খাতের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ৯টি ব্যাংক এই ঋণ বিতরণে অংশ নিয়েছিল।

এবারও কোরবানি ঈদে পশুর চামড়া কেনার সুবিধার্থে ট্যানারি মালিকদের ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা দিয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
নির্দেশনায় বলা হয়, ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫ সালের ঈদুল আজহা উপলক্ষে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম নির্ধারণ করা যাবে না। এই ঋণ ট্যানারি মালিকরা পেলেও এখান থেকে তারা পোস্তার আড়তদারদের দাঁদন দিয়ে রাখলে সেখানকার ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত কাঁচা চামড়া কিনতে পারতেন বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

এত অয়োজনের পরও রাস্তার পাশে চামড়া পড়ে থাকতে দেখা বা মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমি বর্তমানে ঈদ করতে সাতক্ষীরায় অবস্থান করছি। এখানেও খবরে দেখলাম নদীর পাশে চামড়া ফেলে রাখা হয়েছে। এভাবে দেশের সম্পদ নষ্ট হতে দেখাটা খুবই পীড়াদায়ক। এই চামড়াগুলো সংরক্ষণ করতে পারলে দেশের সম্পদ যেমন কাজে লাগতো, তেমনি এর সঙ্গে জড়িত মানুষগুলোর দুইটা পয়সা বাড়তি আয় হতো।’ 

চামড়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী ও শীর্ষস্থানীয় অর্থকরী সম্পদ। প্রধানত গবাদিপশু (গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া) থেকে সংগৃহীত এই কাঁচামাল থেকে জুতো, ব্যাগ ও জ্যাকেটসহ নানা চামড়াজাত পণ্য তৈরি হয়। জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান অপরিসীম হলেও, বর্তমানে এটি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। 

প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্টদের মতে, সারা বছরের মোট কাঁচা চামড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশই আসে কোরবানির ঈদে। আবার দেশের মোট কোরবানির পশুর বড় একটি অংশ ঢাকা বিভাগে জবাই হয়। ২০২৫ সালে ঢাকা বিভাগেই কোরবানি হয়েছে প্রায় ২১ লাখের বেশি পশু, যা মোট কোরবানির প্রায় এক-চতুর্থাংশ।