Image description

বেশ কয়েকবার আলোচনা ও উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই দলের জাতীয় কাউন্সিল সম্পন্নের উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। সবকিছু ঠিকঠাক চললে চলতি বছরের শেষ অর্থাৎ বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দলের ৭ম জাতীয় কাউন্সিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। আর এটি হবে দলীয় প্রধান (চেয়ারম্যান) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রথম জাতীয় কাউন্সিল।

দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগ লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনে থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার দিন জাতীয় কাউন্সিল করা হতে পারে বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে। একান্তই যদি সম্ভব না হয় তাহলে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মদিনের দিনে দলের জাতীয় কাউন্সিলের চিন্তা-ভাবনা দলের আছে বলে জানা গেছে।

তারেক রহমান দলের ৪র্থ দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। গেল ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটির এক জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৮ সাল থেকে তিনি দলটির ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর দলের দীর্ঘকালীন (প্রায় ৪১ বছর) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হলে তারেক রহমান এই সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান। ২য় চেয়ারম্যান বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। ৩য় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। 

গেল ১২ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকদের ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক হয় গত এপ্রিল মাসে। সেই বৈঠকে প্রথম জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

জাতীয় কাউন্সিল সম্পর্কে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙা ও গতিশীল করতে আমরা খুব দ্রুত ৭ম কাউন্সিলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে আরও বিস্তৃত করে কীভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই কাউন্সিল সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। তবে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির কারণে জাতীয় কাউন্সিল সফলভাবে সম্পন্ন করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। তিনি স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেন যে, দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও ২০২৬ সালের মধ্যেই বিএনপির ৭ম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। সেজন্য পুরোদমে কাজ চলছে।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর দলের ৭ম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের এই বার্তাটি বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটি নতুন গতি আনবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, দলের সাংগঠনিক ভিত আরও মজবুত ও আগামী রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। কাউন্সিলকে ঘিরে ইতোমধ্যে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত শুরু হয়েছে তোড়জোড়। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ আন্দোলন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে এবারের জাতীয় কাউন্সিলকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দল এবং এর অঙ্গ সংগঠনগুলোকে তৃণমূল থেকে পুনর্গঠন করে দ্রুততম সময়ে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। কাউন্সিলের আগে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো পুনর্গঠনের মাধ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজ শুরু হয়েছে। সেই হিসেবে ঈদ উল আজহার পর পরই মেয়াদোত্তীর্ণ বিএনপির সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি ঘোষণা করা হবে।

সূত্র জানায়, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে গেল বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই দেশে ফেরাকে আরও স্মরণীয় করে রাখতে ওই তারিখে কাউন্সিল নিয়ে দলে আলোচনা চলছে। 

এর বাইরে বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জন্ম দিন ১৯ জানুয়ারি। এই তারিখ নিয়েও আলোচনা চলছে। সে হিসেবে চলতি বছরের ২৫ ডিসেম্বর বা ২০২৭ সালের ১৯ জানুয়ারি দলের ৭ম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবার সম্ভাবনা বেশি। তবে কাউন্সিলের তারিখ চূড়ান্ত করবেন তারেক রহমান।
বিএনপি নেতারা বলছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর দলের জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও বিগত সরকারের বাধায় গত এক দশকেও তা করা সম্ভব হয়নি। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ সর্বশেষ ৬ষ্ঠ কাউন্সিল হয় রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনিস্টিটিউশনে। এটি হবে সরকারে থেকে দলের ২য় কাউন্সিল। বিএনপি সরকারি দল হিসেবে দলের ৪র্থ কাউন্সিল করেছিল ১৯৯৩ সালে।

দলের নেতারা আরও বলছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে সারাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। সে হিসেবে ডিসেম্বরে না করে জানুয়ারিতে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া কাউন্সিলের প্রস্তুতির জন্য অনেক সময় প্রয়োজন। কারণ, এবার বিএনপি সরকারে। এবারের কাউন্সিল হবে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের কাউন্সিলের আগে দলীয় প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়ার বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়নি। এবারও তারেক রহমানের বিকল্প রাখা হবে না। তবে নিয়ম অনুযায়ী নতুন কাউন্সিলে তাকেও নির্বাচিত হতে হবে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, তারেক রহমান চেয়ারম্যান হয়েছেন একবছরও পূর্ণ হয়নি। নতুন কাউন্সিলে তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকার সম্ভাবনা নেই। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। তবে, এবারের কাউন্সিলে মহাসচিব পরিবর্তনের সম্ভাবনা বেশি। সেক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিকল্প হিসেবে নতুন কাউকে মহাসচিব হিসেবে আনার সম্ভাবনা বেশি।

এদিকে, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির শতাধিক পদ নানা কারণে শূন্য হয়ে আছে। দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির ৫টি পদ শূন্য। এসব পদে স্থান পেতে বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও যুগ্ম মহাসচিব পর্যায়ের প্রায় ২০ জন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে আব্দুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ, শামসুজ্জামান দুদু, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, নিতাই রায় চৌধুরী, নূরুল ইসলাম মনি, অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির, জহির উদ্দিন স্বপন, আফরোজা খানম রিতা, আমিনুর রশিদ ইয়াসিনের নাম আলোচনায় আছে।

এ ছাড়াও আলোচনায় রয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (শিল্প বিষয়ক) ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব (দপ্তরের দায়িত্বে) রুহুল কবির রিজভী, হাবিবুন নবী খান সোহেল, শহিদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী এবং বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, অতীতের চেয়ে এবারের কাউন্সিল নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। এখনো দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। আশা করি, এবারের কাউন্সিল হবে উৎসবমুখর। কাউন্সিলের আগেই সারাদেশে কমিটি পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। 

তিনি বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানই আবারও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। কারণ তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কেউ দলে আছে বলে মনে হয় না। তারপরও আমরা নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আহ্বান জানাবো। কেউ চাইলে করতে পারে। কেউ করবে বলে মনে হয় না।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এবার বিএনপি সরকারে থাকায় দলের কাউন্সিল নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ বেশি। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও শীর্ষ নেতারা কাউন্সিলের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করবেন।

বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীম বলেন, দলের ৭ম জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রচণ্ড আগ্রহ দেখা দিয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা বারবার উদ্যোগ নিয়েও কাউন্সিল করতে পারিনি। এবার মুক্ত পরিবেশে উৎসবমুখর পরিবেশে কাউন্সিলের জন্য নেতাকর্মীরা মুখিয়ে আছেন।

বিএনপির স্থানীয় সরকারবিষয়ক সহ-সম্পাদক শাম্মী আক্তার এমপি বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন চলতি বছরেই দলের সপ্তম কাউন্সিল করা হবে। এছাড়া চলতি বছরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট শুরু হতে পারে। সবাইকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন তিনি।