দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও স্বস্তি ফেরেনি। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বড় রাজনৈতিক সংঘাত কমলেও মব ভায়োলেন্স, মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত এখনও উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। একইসঙ্গে ঝুলে আছে বহুল আলোচিত পুলিশ সংস্কার।
গত ১০ মে পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুলিশ সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীকে কেবল অপরাধী হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘কোনও ফ্যাসিবাদী বা কর্তৃত্ববাদী শক্তি যেন ভবিষ্যতে রাষ্ট্র বা জনগণের বিরুদ্ধে পুলিশকে ব্যবহার করতে না পারে।’’
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের যদি সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ গড়ার লক্ষ্য থাকে, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রণীত পুলিশ অধ্যাদেশটি সংসদে আইন হিসেবে বাস্তবায়ন করা হলো না কেন? পরে প্রয়োজন হলে সংশোধনের সুযোগ তো ছিলই।
প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল স্থিতিশীলতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে মানুষের প্রত্যাশা ছিল— নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, আইনশৃঙ্খলা উন্নত হবে এবং পুলিশ সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসবে।
কিন্তু সরকার গঠনের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশার বড় অংশই অপূর্ণ রয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্তর্বর্তী সরকারের পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে করা অধ্যাদেশটি সংসদে পাশ না হওয়ায় সেটি কার্যত বাতিল হয়ে গেছে।
সংস্কারের অগ্রগতি কোথায়?
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আংশিক ফিরে এলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তাবোধ তেমন বাড়েনি। মানুষ চাইছে— নিরাপদ চলাচল ও হয়রানিমুক্ত আইনশৃঙ্খলা-ব্যবস্থা। নির্বাচনের আগে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিল পুলিশ সংস্কার। লক্ষ্য ছিল, পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, জবাবদিহি বাড়ানো, তদন্ত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এসবের কাঠামোগত কোনও দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘সংস্কার শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে হয় না, ক্ষমতার কাঠামো বদলাতে হয়।’’ তিনি জানান, সংস্কার আটকে আছে মূলত তিন জায়গায়— রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ধীরগতি, প্রশাসনিক প্রতিরোধ ও আইনি কাঠামো পরিবর্তনের জটিলতা। র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনের চাপ থাকলেও বাহিনীটি বিলুপ্ত না করে পুনর্গঠনের মাধ্যমে অতীতের বিতর্ক কাটিয়ে উঠতে চায় সরকার।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচনের পর মানুষের প্রত্যাশা পূরণে পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থায় বাস্তব পরিবর্তন জরুরি। অন্যথায়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেও ধীরে ধীরে জনঅসন্তোষ ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। রাজনৈতিক সরকার টিকে থাকার প্রকৃত পরীক্ষাই হবে আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশ ব্যবস্থায় দৃশ্যমান সংস্কার। কারণ, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অনুভূতি ছাড়া জনগণের আস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়।’’
যা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আধুনিক অপরাধ মোকাবিলা ও পুলিশ সংস্কার এগিয়ে নিতে সরকার বিভিন্ন উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিচ্ছে। পুলিশ সপ্তাহের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে এবং পুলিশ বাহিনীকে সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনে বাংলাদেশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে।’’
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ কেন থেমে গেল?
পুলিশ সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী এ এস এম নাসিরউদ্দিন এলান বলেন, ‘‘দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে তৈরি কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে নতুন সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে খুব বেশি কিছু নয়।’’ তার মতে, অধ্যাদেশটি সংসদে তোলা হয়নি বলেই সেটি বাতিল হয়ে গেছে। যদিও কমিশনে পুলিশ কর্মকর্তা, আমলা, মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুরো স্বাধীন করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনই দলীয় নিয়ন্ত্রণে রাখাও বিপজ্জনক। সমাধান হচ্ছে— জবাবদিহিমূলক, জনবান্ধব মধ্যপন্থা। এ জন্য প্রয়োজন কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা, অভিযোগ তদন্তের দ্রুত প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।’’ তার মতে, কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, যা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারতো।
রাজনৈতিক আনুগত্য বনাম পেশাদারত্ব
অধিকারভিত্তিক থিংক ট্যাংক সপ্রানের গবেষণা পরিচালক মো. জারিফ রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পুলিশের জবাবদিহি যখন রাজনৈতিক ক্ষমতাশীলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখনই পুলিশ জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।’’ নিয়োগ, পদোন্নতি, পোস্টিং ও পদক— সবক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় পুলিশ দীর্ঘদিন উপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যেই আটকে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কাঠামোগত সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাওয়া এবং সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না আসায় নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন জারিফ রহমান। তিনি বলেন, ‘‘পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও পেশাদারত্ব বনাম রাজনৈতিক আনুগত্য বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।’’