► বৈশ্বিক সংকটে বাধাগ্রস্ত বাজেট প্রণয়ন প্রস্তুতি ► ব্যবসাবাণিজ্য চাঙা করতে কমতে পারে করপোরেট কর ►আইএমএফের আপত্তি সত্ত্বেও বাড়ছে ভর্তুকি ► চড়া মূল্যস্ফীতির চাপে সব শ্রেণির মানুষ ► প্রবৃদ্ধি কমবে বিশ্বজুড়ে বলল বিশ্বব্যাংক ►বাজেট বক্তৃতার খসড়ায় চলছে কাটাছেঁড়া
বর্তমান সময়টাকে কভিডের চেয়েও কঠিন মনে করছে সরকার। দেশের ধসে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরুর মধ্যেই সম্ভাবনাগুলো গ্রাস করেছে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। ফলে সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। এরই মাঝে প্রস্তুত করতে হচ্ছে আগামী অর্থবছরের বাজেট। বৈশ্বিক সংকট বারবার বাধাগ্রস্ত করছে বাজেট প্রণয়ন কার্যক্রম। তার পরও সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই সরকার ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিশাল আকারের একটি বাজেট। বাজেট প্রণয়নে সীমিত সম্পদ নিয়ে সমতার বাংলাদেশ গঠনে বিএনপি সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে, অর্থনীতিসহ সামগ্রিক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ করতে মানুষের কাছে আরও কিছুটা সময় চাইবেন তিনি। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার খসড়া সম্পন্ন হয়েছে। চলছে চূড়ান্ত করার কাজ। অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈশ্বিক সংকট বারবার বাধাগ্রস্ত করছে বাজেট প্রণয়ন প্রস্তুতি। অন্যদিকে সরকারের আয়ও কমে গেছে। তাই পরিস্থিতি সামলাতে আইএমএফের আপত্তি সত্ত্বেও বাজেটে ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বলছে, বৈশ্বিক সংকটে প্রবৃদ্ধি কমবে বিশ্বজুড়ে। অন্যদিকে চড়া মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব শ্রেণির মানুষ। রাজস্ব ঘাটতির কারণে গতিহারা হয়ে পড়েছে দেশের বাজেট বাস্তবায়ন পরিস্থিতি।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতিকে ২০২০, ২০২১ ও ২০২২-এ কভিড-১৯ মহামারি সময়ের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, কভিডকালেও এতটা সংকটে পড়েনি বিশ্ব। কেননা সে সময় বিশ্ববাসী ঘর থেকে বেরোতে না পারলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল ছিল। যদিও গতি কিছুটা কমেছিল। তাতে পৃথিবীর অনেক দেশই তখন চরম সংকটে পড়েছিল। তবে তুলনামূলক কম ক্ষতি হয়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির। অবশ্য প্রাণহানির ধারা ঠেকানো যায়নি। এরপর প্রায় চার বছর কেটে গেছে। এর মধ্যে দেশের সরকার বদলেছে দুই দুফা। তৃতীয় সরকার হিসেবে প্রায় ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে বিএনপি। অর্থ বিভাগ সূত্রমতে একদিকে চলছে চরম বৈশ্বিক সংকট, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতি। সরকারের সামনে হাজারো চ্যালেঞ্জ। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। একটার পর একটা অঘটন আর অভ্যন্তরীণ সংকট সঙ্গী করে চলেছে সরকারের তিন মাস। এরই মাঝে চতুর্থ মাসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। যার মোট আকার হতে পারে ৯ লাখ ২০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী ১১ জুন জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এ বাজেটে সরকার বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চড়া পণ্যমূল্য, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কার, বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি, বাজেট বাস্তবায়নে ধীরগতি এমন পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে চায়। এজন্য জনবান্ধব কিছু কর্মসূিচ ইতোমধ্যে শুরু করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং খাল খনন। এ ছাড়া বাজেটে থাকবে আরও নতুন কিছু জনবান্ধব কর্মসূচি। অন্যদিকে ব্যবসাবাণিজ্য চাঙা করতে কমানো হতে পারে সব ধরনের করপোরেট কর। সহজ করা হবে ব্যবসাবাণিজ্য। এমনকি ব্যবসার খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে এ বাজেটে। অর্থনীতির স্রোত আরও শক্তিশালী এবং কার্যকর করতে আবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে; যা বন্ধ করে দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। শুধু তাই নয়, সরকারি চাকুরেদের তুষ্ট করতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে নবম পে-স্কেল; যা গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এতে সরকারের খরচ বাড়বে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি। এতে নতুন বছরে মূল্যস্ফীতির এ চাপ আরও বাড়বে।
ফলে প্রবৃদ্ধিসহায়ক বাজেট প্রণয়নের কথা ভুলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বাজেটে অধিক গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, আসছে বাজেটটা হবে নতুন এক প্রেক্ষাপটে জনপ্রত্যাশার, যেখানে প্রতিফলিত হতে হবে জনগণের স্বার্থ। জানা গেছে, এবারের বাজেটে আয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিকভাবে বাজেটে ঘাটতি হতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে নির্ভর করতে হবে দেশি কিংবা বিদেশি উৎসের ওপর। সরকারের আয় বাড়াতে সব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে এক ছাতার নিচে এনে করব্যবস্থার ভিতরে ঢোকানো হচ্ছে। করের আওতা এমনভাবে বাড়ানো হচ্ছে যে বছরে অন্তত ন্যূনতম একটা কর দিতে হবে একজন ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক উদ্যোক্তাকেও। এ ছাড়া ধনীদের সম্পদের ওপর আরোপ করা হতে পারে সারচার্জ। একইভাবে মোটরসাইকেল ও চার্জার রিকশার মালিকদেরও আয়করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পক্ষান্তরে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি দিতে এসব পণ্য আমদানিতে করছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। ফলে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে বাড়বে ভর্তুকির পরিমাণ। এর সঙ্গে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ বহাল রাখায় এ খাতেও ভর্তুকির পরিমাণ বাড়বে।
ফলে বাজেটে সামগ্রিক ব্যয়ের মাত্রা বাড়বে। এতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হতে পারে ১ লাখ কোটি টাকা। ঘাটতির বাকি ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এরই মধ্যে আইএমএফের চাপে পড়ে ভর্তুকি কমাতে দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের কম সময়ের মাথায় সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে হুহু করে। বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব ঘাটিতও ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচির ধারা স্বাভাবিক রাখতে প্রথমবারের মতো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এডিপির আকার হতে যাচ্ছে ৩ লাখ কোটি টাকা; যা চলমান এডিপির চেয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অনেক দিন পর দেশের মানুষ ভোট দিয়ে একটা সরকার গঠন করেছে। ফলে এ সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এজন্য প্রথম বাজেটের দিকে নজর থাকবে প্রায় সব শ্রেণির মানুষেরই।’
কাঁচামালে এআইটি কমানোর পরিকল্পনা : বর্তমানে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। নতুন বাজেট প্রস্তাবে পণ্যের ধরন অনুযায়ী এ হার কমিয়ে ৪ কিংবা ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার চিন্তা করছে সরকার। কারণ ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, আমদানি পর্যায়ে উচ্চ হারের অগ্রিম আয়কর তাদের নগদ অর্থপ্রবাহে বড় চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর শিল্পগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং কার্যকর মূলধনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
অতি ধনীদের জন্য আসছে সম্পদকর : এবারের বাজেটে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হতে যাচ্ছে ‘সম্পদকর’। বর্তমানে উচ্চসম্পদের ব্যক্তিদের ওপর সারচার্জ আরোপ করা হয় প্রদেয় আয়করের ওপর ভিত্তি করে। নতুন প্রস্তাবে সারচার্জ তুলে দিয়ে সরাসরি সম্পদের মূল্যের ওপর কর আরোপের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩০ হাজার করদাতা রয়েছেন, যাদের আয় দেড় কোটি টাকার বেশি। নতুন করহার কার্যকর হলে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করছে সরকার।
মধ্যবিত্তের জন্য কিছুটা স্বস্তি : সাধারণ করদাতাদের চাপ কমাতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা। নতুন বাজেটে তা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হতে পারে।
ফিরতে পারে কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ : বাজেটে সবচেয়ে বিতর্কিত আলোচনাগুলোর একটি হলো অপ্রদর্শিত আয় বা কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ ফের চালু করা। তবে এবার আগের মতো নির্দিষ্ট কম হারে নয়, বরং নিয়মিত করহারেই এ সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ যে অর্থবছরে আয় গোপন করা হয়েছিল, সেই সময়কার নির্ধারিত করহার অনুযায়ী কর পরিশোধ করে সম্পদ বৈধ করা যাবে। পাশাপাশি আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে, যাতে আয়কর বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থা আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে।
বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বাড়ানোই মূল লক্ষ্য : অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এবারের বাজেটে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগ উৎসাহের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। কারণ একদিকে সরকারকে উচ্চ ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়াতে হবে, অন্যদিকে অতিরিক্ত করের চাপে ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্প খাত আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ অবস্থায় কাঁচামালে এআইটি কমানো, করহার আগাম ঘোষণা এবং করকাঠামোকে আরও স্থিতিশীল করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে কিছুটা হলেও সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।