গ্রামীণ দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা–এমন দৃঢ় লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে কমিউনিটি ক্লিনিক। পৌঁছে যেতে থাকে গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা। ১৯৯৬ সালে কার্যক্রম গ্রহণের পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত–সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা সুবিধা-অসুবিধা সঙ্গী করে চলছে এই গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমকে গতিশীল ও টেকসই করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ২০১৮ সালে ‘কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট বিল’ পাস হয়। এই আইনে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পরচালিত হচ্ছে।
বন্ধ ওষুধ সরবরাহ
বিভিন্ন জেলায় গ্রামীণ গণমানুষের প্রত্যাশিত এই স্বাস্থ্য খাতে হোঁচট লেগেছে। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ১৫১ কমিউনিটি ক্লিনিকে বন্ধ রয়েছে ওষুধ সরবরাহ। কয়েক মাস ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল। প্রতিদিন রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ পেলেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে বাড়ি। প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে চিকিৎসা বন্ধ করে দিচ্ছেন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচটি উপজেলায় মোট ১৫১ কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় ৩৬, শিবগঞ্জে ৫৬, গোমস্তাপুরে ২৪, নাচোলে ১৯ এবং ভোলাহাটে ১৬ কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে।
এসব ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ সাধারণ চিকিৎসা, মাতৃসেবা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের তীব্র সংকটের কারণে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।
রোগীদের হতাশা
সরেজমিনে দেখা গেছে, রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ বা ব্যবস্থাপত্র পেলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিশেষ করে জ্বর, সর্দি-কাশি, গ্যাস্ট্রিক, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিকসের রোগে আক্রান্তরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের আমনুরা কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসাবেসা নিতে আসা গৃহিণী রহিমা খাতুন জানান, তার ডায়াবেটিকস ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে। সপ্তাহে দুই দিন এখান থেকে কিছু ওষুধ পেতেন। গত ৯ মাস ধরে কোনো ওষুধ না পাওয়ায় এবং বাইরে থেকে কিনে খাওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তিনি চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।
একই রকম কষ্টের কথা জানান শিবগঞ্জের দুলর্ভপুর এলাকার তাহেরা খাতুন নামে এক মধ্যবয়সি নারী। তিনি বলেন, যেখানে সংসার চালানোই কঠিন, সেখানে ফার্মেসি থেকে চড়া মূল্যে ওষুধ কেনা তাদের পক্ষে অসম্ভব।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিউনিটি ক্লিনিকের একাধিক হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) জানান, প্রতিদিন অনেক অসহায় মানুষ ওষুধের আশায় ক্লিনিকে আসেন। কিন্তু কাউকেই ওষুধ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে রোগীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যকর্মীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
সংকটের নেপথ্যে কী
প্রশাসনিক ও প্রকল্পগত জটিলতার কারণে সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তে এই জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে–রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে প্রকল্পের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়। কিছু দিন সীমিত আকারে ওষুধ দেওয়া হলেও কয়েক মাস ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ চেইন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল উদ্দিন জানান, অপারেশন প্ল্যান প্রকল্পের মাধ্যমে ২২ ক্যাটাগরির ওষুধ সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে একটি ট্রাস্টের ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় চালুর চেষ্টা চলছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দীন জানান, মূলত কেন্দ্রীয়ভাবে সাপ্লাই বন্ধ থাকার কারণেই মাঠপর্যায়ে ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। খুব শিগগির নতুন করে ওষুধের বরাদ্দ আসবে বলে আশা প্রকাশ করা যায়।
ভিন্ন কথা স্বাস্থ্য বিভাগের
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আওতাধীন ‘কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট’-এর পক্ষ থেকে ওষুধ বিতরণের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ হয় ২১ মে। এতে বলা হয়, বর্তমানে ১৪ হাজার ৪৬০টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। ক্লিনিকে ওষুধের কোনো সংকট নেই। কার্যক্রম পুরোদমে চলমান আছে। প্রতিটি ক্লিনিক থেকে নির্ধারিত ২২ প্রকার ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান গণমাধ্যমে বলেন, আমাদের কার্যক্রম পুরোদমে চলমান আছে। কোথাও কোনো ওষুধের ঘাটতি নেই। সাময়িক সংকট থাকা জায়গায় ওষুধ পাঠানো হয়ে গেছে।
খুলনা অঞ্চলের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, খুলনা জেলার ৯টি উপজেলায় বর্তমানে ওষুধ সরবরাহ রয়েছে। প্রতি কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য একটি কার্টুন করে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। সেই মোতাবেক তা বিতরণও করা হয়েছে। বর্তমানে ক্লিনিকে যে পরিমাণ ওষুধ আছে, তা দিয়ে আগামী দেড় মাস সংকুলান হবে।