ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা থাকলেও ক্রমেই তা খারাপের দিকে যাচ্ছে। চুরি, ছিনতাই ও হত্যার পাশাপাশি সবচেয়ে আতঙ্কজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শিশুধর্ষণসহ নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী ও কন্যাশিশুরা।
গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে এটি যেন জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সংস্থাটির লিগ্যাল উইংয়ের সংরক্ষিত গত ছয় মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের নভেম্বরে মোট ১৮১ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়। ডিসেম্বরে তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১৫৯ জনে।
তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সমানভাবে ১৮৩ জন করে নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু এরপর থেকেই শুরু হয় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি, যা মার্চে ১৯০ এবং এপ্রিলে সর্বোচ্চ ২২০ জনে পৌঁছায়। মে মাসের পরিসংখ্যান এখনও প্রস্তুত না হলেও এরই মধ্যে সেটি এপ্রিলের সংখ্যাও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছে মহিলা পরিষদ।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানেও নারী ও শিশু নির্যাতনের আরও ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, গত বছরের নভেম্বরে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল ১ হাজার ৭৪৪টি, যা ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কিছুটা কমে যথাক্রমে ১ হাজার ২৪৮ এবং ১ হাজার ২৮১টিতে দাঁড়ায়।
তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বনিম্ন ১ হাজার ১৮১টিতে নামলেও পরবর্তী মাসগুলোয় চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। মার্চে এর সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৮৫টি এবং এপ্রিলে তা সর্বোচ্চ ২ হাজার ১১টিতে পৌঁছায়।
পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ফেব্রুয়ারির তুলনায় এপ্রিলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। ঢাকার শিল্পাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলো (ঢাকা রেঞ্জ) নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঢাকা রেঞ্জে সব মাসেই ঘটনার সংখ্যা অন্যসব ইউনিটের তুলনায় বেশি ছিল, যেখানে এপ্রিলে সর্বোচ্চ ৩৭৫টি ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম রেঞ্জে এপ্রিলে ২৮৫টি এবং রাজশাহী রেঞ্জে ২৫২টি ঘটনা ঘটেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় অপরাধের হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ধরনের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা গত দুই মাসে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ধর্ষণের (দলবদ্ধ ও হত্যাসহ) গড় হার ছিল ৩০ থেকে ৪৫-এর মধ্যে। কিন্তু মার্চে তা বেড়ে ৫৭ এবং এপ্রিলে ৫৮ জনে পৌঁছায়। শুধু এপ্রিলেই দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭ জন, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনাও এই সময়ে কয়েক গুণ বেড়েছে। এপ্রিলে ১২ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল তিনজন।
সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিলে সর্বোচ্চ ৫৭ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১৬ জন ছিল শিশু। এর আগে জানুয়ারিতেও ৫৫ জন নিহত হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এই সংখ্যা কিছুটা কমে যথাক্রমে ৩২ ও ৪৭-এ নেমে আসে। নারী ও শিশু পাচার এবং অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি মাস ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনক। যেখানে ২০ জন কন্যাশিশুসহ ৪০ জন পাচারের শিকার হওয়ার তথ্য মহিলা পরিষদের সংরক্ষিত তথ্যে পাওয়া যায়।
একই চিত্র দেখা যায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসের পরিসংখ্যানেও। এই সময়ের মধ্যে শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১৯৯টি, যার মধ্যে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ৯৪টি ধর্ষণের ঘটনা। শিশুদের ওপর হওয়া অপরাধের মধ্যে ১৬টি শিশু ছয় বছরের কম বয়সী এবং ৪০টি শিশুর বয়স ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ছিল।
তারা জানায়, এই চার মাসে মোট ১১৫টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের কারণে ৩৪ জন এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলে নির্যাতনের কারণে ২৫ জন প্রাণ হারিয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১টি শিশুকে এবং দুজন ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৮০ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টি ছিল দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর ১৭ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।
বিচারহীনতাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো নিয়ে এশিয়া পোস্টের কথা হয় নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্তের। তিনি বলেন, একটা অপরাধের শাস্তি না হলে আরও অনেক অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি হয়। প্রতিদিন যেসব ঘটনা ঘটছে, একটারও সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না। বরং অপরাধীরা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনের চাপে বিচার শুরু হলেও শাস্তি কার্যকর হয় না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অপরাধীরা অপরাধ করেই যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া মাদক, জুয়া, বেকারত্বের মতো বিষয়গুলোও একটা বড় কারণ হিসেবে এগুলোর পেছনে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, তাদের কাজগুলো স্বাধীনভাবে করতে পারলে, মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারলে এসব কমে যেত। তারা সেটা করতে পারে না।
এসব বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সীমা দত্ত বলেন, প্রধান কথা হচ্ছে, দেশে যদি বিচার থাকত, মানুষ আইনের কাছে গিয়ে তার সমস্যার কথা তুলে ধরলে বিচার পেত, তাহলে সমস্যা সমাধান হতো। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অবশ্যই নিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। যে সংগঠনগুলো আছে, তাদের মাধ্যমে এই মেসেজটা সবার কাছে দেওয়া দরকার যে অপরাধী যে-ই হোক তার অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। সে জন্য একটা সামাজিক গণআন্দোলন গড়তে হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম বলেন, আমাদের সমাজ একটা অপরাধপ্রবণ সমাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে মানুষের আচরণ ক্রমান্বয়ে হিংস্র হয়ে উঠছে। সাধারণ ইস্যুতেই মানুষ হিংস্র হয়ে যাচ্ছে। যে অপরাধী, সে বারবার অপরাধ করে, কারণ তার অপরাধের কোনো বিচার হয় না। সে যে অপরাধ করছে, এই বার্তাটাই তার কাছে থাকে না।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতার যে দাপট এখানে, এর কারণে অপরাধীরা হয়ে যাচ্ছে নায়ক আর ন্যায় কাজগুলো হয়ে যাচ্ছে অপরাধ। এর মধ্যে সমাজ তো অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠবেই। তার মধ্যে নেই কোনো সাংস্কৃতিক চর্চা, কোনো গানবাজনা নেই। কোনো স্কুল-কলেজে লেখাপড়া নেই। শিক্ষকদের অপমান করা হচ্ছে, ধর্মের কথা বলে নারীদের অপমান করা হচ্ছে। এসব কিছু তো সমাজটাকে একটা অস্থির ও অপরাধপ্রবণ সমাজ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
বিচারের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে না পারলে এসব অপরাধ কখনোই কমবে না; বরং বাড়তে থাকবে বলে মনে করেন মহিলা পরিষদের এই সভাপতি।