আউটসোর্সিংয়ে লোক নিয়োগে ডাকা হলো প্রায় ২ কোটি টাকার টেন্ডার। ই-জিপি প্লাটফর্মে রাত সাড়ে ৩টায় এলো ‘নেগোসিয়েশনের’ নোটিস। অগোচরে সেই কার্যাদেশ বাগিয়ে নিচ্ছে সিভিল সার্জনের পছন্দের এক প্রতিষ্ঠান।
সম্প্রতি পাবনার সিভিল সার্জন অফিসের বিরুদ্ধে বিধি ভেঙে টেন্ডার দেওয়ার এমন অভিযোগ তুলেছে দরপত্র জমা দেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। লিখিতভাবে তা জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটিকে (বিপিপিএ)। টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিতের দাবিও তুলেছেন ঠিকাদাররা।
সিভিল সার্জন অভিযোগের একাংশ স্বীকার করলেও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য প্রতিবেদককে দেখালেন আদালত!
ভাইভা ছাড়াই মূল্যায়ন
সম্প্রতি পাবনা সিভিল সার্জন অফিস থেকে আহ্বান করা ওই টেন্ডারে অংশ নেয় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সরকারি কেনাকাটার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার (পিপিআর) ‘আইটিটি ক্লজ ৪১(বি)’ অনুযায়ী, সব দরদাতাকে মূল্যায়ন করা হয় ১০০ পয়েন্টে। এর মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতায় ৫৪.৫৫ শতাংশ এবং মৌখিক পরীক্ষায় বরাদ্দ ৪৫.৪৫ শতাংশ নম্বর।
অভিযোগ উঠেছে, এই শর্তের তোয়াক্কা করেনি সিভিল সার্জন কার্যালয়। কোনো ধরনের মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই ‘স্টেট সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান পেয়ে গেছে ওই ১ কোটি ৯১ লাখ ৯৫ হাজার ৭১৫ টাকার কাজ করার প্রাথমিক স্বীকৃতি বা এনওএ (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড)।
গভীর রাতে এক ঘণ্টার ‘নেগোশিয়েশন’ নোটিস
‘বঞ্চিত’ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ফিরোজ এন্টারপ্রাইজ। এর প্রধান ফিরোজ হোসেনের অভিযোগ, দরপত্রের পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিত।
গত ২৯ এপ্রিল রাত ৩টা ৩৫ মিনিটে ই-জিপি সিস্টেমে দরকষাকষির (নেগোসিয়েশন ইনভাইটেশেন) আমন্ত্রণ পান ফিরোজ। সাড়া দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয় মাত্র এক ঘণ্টা।
পরে ই-জিপি সিস্টেমে আমন্ত্রণে সাড়া দিতে গেলে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে- ‘দ্য নেগোসিয়েশন টাইম হ্যাজ নট স্টার্টেড ইয়েট অর হ্যাজ অলরেডি এলাপস্ড’ এবং ‘ফেইলড’ লেখা। যার অর্থ- দরকষাকষির সময় এখনো শুরু হয়নি কিংবা শেষ হয়ে গেছে।
দাপ্তরিক সময়ের বাইরে গভীর রাতে মাত্র এক ঘণ্টার এই অস্বাভাবিক সময়সীমাকে অংশগ্রহণকারীরা দেখছেন ন্যায্য সুযোগ খর্বের কারসাজি হিসেবে।
এই টেন্ডারে অংশ নেওয়া আরেক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘টিএসএল’। এর প্রতিনিধি আবদুর রায়হান নয়ন বললেন, ‘কোনো রকম নিয়মনীতি অনুসরণ না করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে রি-শিডিউলের দাবি জানাচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অভিযোগ দিয়েছি। প্রতিকার না পেলে আইনের আশ্রয় নেব।’
এসব অভিযোগ নিয়ে পরদিনই সিভিল সার্জনের সঙ্গে মোবাইল ফোন ও ই-মেইলে যোগাযোগ করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। ‘বিষয়টি দেখছি’ বলে জবাব আসে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে। এরপর তড়িঘড়ি করে কার্যাদেশের এনওএ দেওয়া হয় স্টেট সার্ভিসেস লিমিটেডকে, বলেছেন অভিযোগকারী ঠিকাদাররা।
বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন
সিভিল সার্জন অফিসের এই কর্মকাণ্ডকে সরকারি ক্রয় আইনের স্বচ্ছতা ও সমতার নীতির পরিপন্থী বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, ‘টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলাকালে গভীর রাতে তথাকথিত ‘নেগোসিয়েশন’ ই-মেইল পাঠিয়ে মাত্র ১ ঘণ্টার সময় দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এতে পুরো ক্রয় প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’
বিপিপিএ- এর পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ)- ২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)- ২০০৮ অনুযায়ী সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে অবশ্যই স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত আচরণ, সমান সুযোগ ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। জানালেন নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এই সাবেক কর্মকর্তা।
অভিযোগকারী ফিরোজ হোসেন বললেন, ‘আমরা শুরু থেকেই স্বচ্ছতার সঙ্গে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু গভীর রাতে এক ঘণ্টার নোটিসে আমাদের সিস্টেমে ঢুকতে না দেওয়া এবং নিয়মানুযায়ী ভাইভা না নিয়েই অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে, এখানে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন ও অনিয়ম হয়েছে। আমরা বিপিপিএ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। এই টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় স্বচ্ছ মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছি।’
যা বলছেন সিভিল সার্জন
অভিযোগের বিষয়ে জানতে জেলা সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগামীর সময়। এ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে নারাজ তিনি। তবে দাবি করেন, ই-জিপি সিস্টেমের নিয়ম মেনেই সব করা হয়েছে।
মৌখিক পরীক্ষা না হওয়ার বিষয়টি অবশ্য স্বীকার করলেন। বললেন— ‘পরীক্ষা না হলেও সবাইকে সমান নম্বর দেওয়া হয়েছে।’ পরীক্ষা না নেওয়ার এবং এভাবে নম্বর দেওয়ায় কারণ জানতে চাইলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিবকে প্রশ্ন করতে বলেছেন তিনি।
কথা হয় মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব ও সম্প্রতি বদলি হওয়া সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলী মাজরুইয়ের সঙ্গে। তারও দাবি, এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। কারণ ই-জিপি পদ্ধতিতে দরপত্র মূল্যায়নে কোনো অনিয়ম হলে তা সংরক্ষিত থাকে।
মৌখিক পরীক্ষা হয়েছে কি না— এ প্রশ্ন এড়িয়ে বললেন, কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদন ছাড়া কথা বলবেন না সংবাদমাধ্যমে। উল্টো প্রতিবেদককে দিলেন আদালতে মামলা করার পরামর্শ।