রাজধানীর পল্লবীতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার ৭ বছরের শিশু রামিসা আক্তারের জানাজা শেষে তার মরদেহ দাদা-দাদির কবরের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। বুধবার (২০ মে) এশার নামাজের পর মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের মধ্য শিয়ালদি গ্রামের মোল্লা বাড়ির বায়তুল আমান জামে মসজিদের আঙিনায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। পরে শোকাবহ পরিবেশে তাকে দাফন করা হয়।
ঘটনায় গ্রেপ্তার সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে তিনি জবানবন্দি দেন। একই ঘটনায় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রামিসার মা পারভীন আক্তার জানান, ঘটনার দিন সকালে তার মেয়ে স্বাভাবিকভাবেই ঘুম থেকে উঠে বাইরে বের হয়। এরপর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে তিনি মেয়েকে ডাকাডাকি করতে থাকেন। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি বাইরে বের হয়ে খোঁজ শুরু করেন। একপর্যায়ে পাশের বাসার সামনে রামিসার স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখেন তিনি।
তিনি বলেন, সন্দেহ হওয়ায় পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। হতে পারে, আমি যখন দরজায় নক করছিলাম, তখনই হয়তো ভেতরে আমার মেয়েটাকে হত্যা করা হচ্ছিল। দরজা না খোলার কারণ ছিল তারা পালানোর চেষ্টা করছিল। পরে আশপাশের লোকজন জড়ো হলে তারা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দেন। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং একটি কক্ষে স্বপ্না আক্তারকে দেখতে পায়। পরে খাটের নিচ থেকে শিশুটির মরদেহ এবং বাথরুম থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয় বলে তিনি জানান।
রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার কোনো শত্রু ছিল না, কোনো ধরনের বিরোধও ছিল না। তারপরও তার সন্তানকে কেন এভাবে হারাতে হলো—এ প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, মেয়ের দৈনন্দিন কথা, আবদার ও ডাক সবকিছুই এখন তার স্মৃতিতে বেদনার মতো ফিরে আসছে।
তিনি আরও বলেন, আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। বিজ্ঞাপন তিনি বলেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।
ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে ৩৪ বছর বয়সী সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে। একই সময় ঘটনাস্থল থেকে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আটক করা হয়। সোহেল পেশায় রিকশা মেকানিক বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে আদালতে হাজির করা হলে সোহেল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তদন্ত কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, ঘটনার দিন তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন এবং শিশুটিকে জোর করে ঘরে নিয়ে যান। এরপর তাকে নির্যাতন ও হত্যার পর মরদেহ গুমের চেষ্টা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
পুলিশ আরও জানায়, মরদেহ টুকরো করে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করা হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। ঘটনার সময় জানালার গ্রিল কেটে পালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্তরা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার ক
যা আছে জবানবন্দীতে
জবানবন্দি ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তারা। এ সময় ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে শিশুটির মাথাবিহীন মরদেহ এবং আরেকটি কক্ষে বালতির ভেতর তার খণ্ডিত মাথাটি দেখতে পান তারা।
মূলত মাদক সেবন করে বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া এই আসামি জবানবন্দিতে জানায়, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে তার পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না। ঘটনার দিন স্বপ্না আক্তার শিশুটিকে রুমের ভেতর নিয়ে যাওয়ার পর সোহেল তাকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করে। এতে রামিসা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এরই মধ্যে তার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকলে সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী স্বপ্নাও একই রুমে অবস্থান করছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে রামিসার ওপর চরম নৃশংসতা চালানো হয়। সোহেল ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার মাথা কেটে শরীর থেকে আলাদা করে এবং তার সংবেদনশীল অঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। এ ছাড়া দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহটি বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। নৃশংস এই অপরাধ শেষে কক্ষের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল রানা।