পর্দাহীন জানালার কাচ ভেদ করে টাইলস করা ফ্লোরে এসে পড়েছে কড়া রোদ। ধুলা জমা ফ্লোরে ধূসর দেখায় রোদের রঙ। রুমের এক পাশে সারি সারি বেড। বিছানার ওপর বালুর চাদর। পাশে লাগোয়া নানা যন্ত্রপাতি। আঁকাবাঁকা হয়ে সেগুলো দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কালের মতো। ব্যবহার না হওয়ায় দামি যন্ত্রগুলো নষ্ট হওয়ার পথে। এভাবেই কাতরাচ্ছে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আধুনিক বার্ন ইউনিট। দেখে যেন মনে হয়, প্রতিদিন পুড়ছে ‘অবহেলার আগুনে’।
সেই হাসপাতালে যান প্রতিবেদক। গিয়ে দেখেন, নার্সরা নিজেদের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করছেন সামনের দুটি রুম। ইউনিটের মূল রুম দুটি তালাবদ্ধ। ভেতরে পড়ে থাকা মূল্যবান বিছানাগুলো ধুলার আস্তরণে ঢাকা। প্রতি কোনায় মাকড়সার জাল, এখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা। উড়ছে মশা-মাছি। ইউনিটের পশ্চিম পাশে গিয়ে দেখা যায় পুরনো ডাস্টবিন। কাগজের কার্টন। এসবের ওপর বিড়ালের শুকিয়ে যাওয়া মল।
তবে এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। প্রায় সাত বছর আগে হাসপাতালটিতে তৈরি করা হয় ১০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক বার্ন ইউনিট। কিন্তু সেটি শুধু নামেই। নেই কোনো জনবল। পৌনে ৪ কোটি টাকা খরচে বানানো এই ইউনিট পড়ে আছে পরিত্যক্ত ঘর হিসেবে।
করোনার পর বার্ন ইউনিট চালু করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি
মজিদুল ইসলাম
তত্ত্বাবধায়ক, মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল
হাসপাতালটির শুরুর বিষয়টি জানা যায় সংশ্লিষ্টদের মুখ থেকে, ২০১৪ সাল। উত্তাল রাজনৈতিক অঙ্গন। সে সময়ই জেলা হাসপাতালগুলোয় বার্ন ইউনিট চালুর সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন সরকার। এরপর ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় এক জনসভায় মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে আগুনে পোড়া, অ্যাসিডদগ্ধসহ চর্ম সমস্যার রোগীদের সেবায় বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট করার ঘোষণা দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৯ সালের অক্টোবরে করা হয় ১০ শয্যার আধুনিক এই বার্ন ইউনিট। সিনিয়র-জুনিয়র কনসালট্যান্টসহ পদ রাখা হয় মোট ৬৩টি। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে কোনো জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
তাই বগুড়াবাসীর সবশেষ আশ্রয়স্থল শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালই থেকে যায়। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, সার্জারি বিভাগের একটি অংশে চলছে আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা। প্রাথমিক চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ। পোড়া বেশি হলে চিকিৎসা দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। এর প্রমাণ মেলে গত এপ্রিল মাসে। আগুনের গুরুতর ক্ষত নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন শিবগঞ্জ উপজেলার মো. শোয়েব উদ্দিনের ছেলে মো. মুকুল (৪০)। বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি।
জেলা হাসপাতালে এমন বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট করা অনেকটা অপরিকল্পিত উদ্যোগ বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। কারণ হিসেবে মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক রাশেদুল ইসলাম রনির অভিমত, ‘আগুনে পোড়া রোগীর চিকিৎসা জটিল প্রক্রিয়া। এমন রোগীর চিকিৎসা দিতে অন্য বিশেষজ্ঞদের মতামতের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু জেলা সদর হাসপাতালে সেই সুযোগ কোথায়? এজন্য এসব বিশেষায়িত ইউনিট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখতে হয়। সেখানে একাধিক বিভাগ আছে। প্রয়োজনে মেডিকেল টিম গঠন করে রোগীর সেবা দেওয়া
সম্ভব হয়।’
একই রকম মত দেন হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক মজিদুল ইসলাম। তার ভাষ্য, ‘করোনার পর বার্ন ইউনিটকে চালু করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমি এখানে যোগ দেওয়ার পর এটিকে বার্ন ইউনিট, আইসিইউ বা সিসিইউ— কী হিসেবে চালু করা যায়, সেই ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। এটিকে যা-ই করা হোক না কেন, অবশ্যই এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন।’
এদিকে নিজেদের অক্ষমতার কথা অকপটে স্বীকার করেন শজিমেক হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহারুল আলম মণ্ডল, ‘আমাদের এখানে অনেক দগ্ধ রোগী আসেন। প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আমরা বেশি সেবা দিতে পারি না। ৫০ বা ৬০ শতাংশ পোড়া হলে সেই রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকায় রেফার করি। তবে এখানে চিকিৎসক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলে উন্নত সেবা দিতে পারতাম।’