‘স্বাভাবিক যে কোনো মানুষ রাতে ঘুমায়। কিন্তু তিনটি বছর রাতে ঘুম নেই আমার। প্রতিদিন রাত ৮টার সময় দুবাইয়ে বাসার সামনে মাইক্রোবাস আসত। যে কয়েকজন বাসায় থাকতাম, সবাইকে ডান্স ক্লাবে নিয়ে যেত। কখনও ১২-১৫ জন, কখনও আরও বেশি থাকতাম। সবাই বাংলাদেশি। ভোর পর্যন্ত ক্লাবে থাকতে হতো। বারে দেশি-বিদেশি যারা আসত, তাদের খুশি করতে না পারলে মালিকের নির্যাতন সইতে হতো। ঘুমাইতে দিত না। প্রতিদিন বাসায় ফেরার পর অনেক মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করত। আমি চাই, শত্রুকেও যেন সেখানে নেওয়া না হয়।’
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইফেরত রুপালি (ছদ্মনাম) এভাবেই তাঁর জীবনের বিভীষিকার কথা সমকালকে বলছিলেন।
ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা রুপালির মাধ্যমে দুবাইয়ে বাংলাদেশি তরুণী পাচার চক্রের খোঁজ সামনে এলো। দুবাইয়ে যেখানে রুপালি ছিলেন, সেখানে একই চক্রের কাছে জিম্মি আছেন বাংলাদেশি ১৪ তরুণী। তাদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা চাইবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ পুলিশের যোগাযোগ হয়েছে। রুপালি তাঁর জীবনের দুর্বিষহ বর্ণনা তুলে ধরে রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন।
গত ১৪ মে রুপালিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় পাচারকারী দলের অন্যতম সদস্য আব্দুল হান্নানকে। পাসপোর্ট ও বেতন বাবদ পাওনা ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করার প্রলোভন দেখিয়ে ওই দিন রুপালিকে আবার দুবাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
তিন বছর আগে রুপালিকে মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতনে একটি রেস্তোরাঁয় চাকরি দেওয়ার কথা বলে দুবাইয়ের বিলাসবহুল শহরে নেওয়া হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল ২০। স্বপ্ন নিয়েই ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল দুবাই গিয়েছিলেন তিনি। তবে কাজের পরিবর্তে তাঁকে দেওয়া হয় ভ্রমণ ভিসা। লেখাপড়া কম থাকায় বিষয়টি ধরতে পারেননি রুপালি।
রুপালি সমকালকে বলেন, ‘তিন বছর আগে দুবাইয়ে বিমানবন্দরে নামার পরপরই আমার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর আমাকে একটি বাসায় রাখা হয়। সেখানে ১০-১২ জন বাংলাদেশি মেয়ে ছিল। দু-একদিন যাওয়ার পর আমার কাজের বিষয়টি জানতে চাই। আগে থেকে যারা সেখানে ছিল তারা বলে, রেস্টুরেন্টের কোনো কাজ নেই। এখানে যারা আসে, সবাইকে ডান্স বারে কাজ করতে হয়। যাদের সঙ্গে আমাকে রাখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী ছিলাম আমি। তাই আমার জন্য সবকিছু মেনে নেওয়া কঠিন ছিল।’
নিজের জীবন ও পরিবারের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে রুপালি বলেন, ‘অনেক মেয়ের জীবন তো শেষ হয়ে গেছে। মানসম্মানের কথা ভেবে মুখ খোলে না। একবার নাম জানাজানি হয়ে গেলে দেশে ফিরে অন্য কোনো কাজ করে বেঁচে থাকব– এমন আশাও থাকে না। অনেকে খারাপ চোখে তাকায়। তবে আমি প্রতিবাদ করেছি; রুখে দাঁড়িয়েছি।’
রুপালি বলেন, ‘প্রায় ১০ বছর আগে আমার মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। এরপর মা আর ছোট ভাইকে নিয়ে সংকটে পড়ি। একসময় রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে কানের দুল তৈরির কারখানায় সামান্য বেতনে চাকরি করতাম। মা বাসায় কাপড়ের ওপর পাথর বসানোর কাজ করতেন। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর বিদেশ যাওয়ার চিন্তা করি। তখন পাসপোর্ট করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের পারভেজ নামে একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। তার বিস্তারিত পরিচয় জানা নেই। ভালো বেতনে চাকরির জন্য দুবাইয়ের ভিসা দিতে পারবে বলে আশ্বাস দেয় পারভেজ। বিদেশে গিয়ে সর্বনাশের শুরুটা পারভেজের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরেই। এরপর পারভেজের মাধ্যমে কুমিল্লার বাসিন্দা হান্নানের সঙ্গে পরিচয় হয়।’
বৈশাখী হলি ডে বিচ ক্লাব
রুপালির মাধ্যমে দুবাইয়ে বাংলাদেশি নারী পাচারের আন্তর্জাতিক যে চক্রের তথ্য সামনে এলো, তার কেন্দ্রে রয়েছে বৈশাখী হলি ডে বিচ ক্লাব। রুপালি ছাড়াও এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুবাইয়ের এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম মালিক কুমিল্লার বাসিন্দা আব্দুল হান্নান। সে অধিকাংশ সময় দুবাই থাকে; মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আসে। তার ভাগনে ইমরান ছাড়াও কয়েকজন ক্লাবটি দেখাশোনা করে।
রুপালি সমকালকে জানান, যন্ত্রণাদায়ক জীবন সইতে না পেরে কয়েকটি মেয়ে ওই ক্লাব থেকে পালিয়েছে। পাসপোর্ট আটকে থাকা ও বেতন না পাওয়ায় পালানোর সাহস করেননি তিনি। কারণ, পালাতে গিয়ে অনেককে দেশটির পুলিশের হাতে আটক হতে হয়। যেতে হয় কারাগারে।
রুপালি বলেন, দুবাইয়ে থাকাকালে মায়ের অসুস্থতা বা ঈদের সময় বেতন চাইলে ১০-১৫ হাজার টাকা দিত। পুরো বেতন চাইলে অন্যত্র বিক্রি করার ভয় দেখাত। অনেক আকুতির পর চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে এর জন্য শর্ত দেওয়া হয়। ঢাকায় নেমেই পাসপোর্ট হান্নানের এক সহযোগীর কাছে দিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া কয়েক মাস দেশে থাকার পর আবার তাঁকে দুবাই ফিরে যেতে হবে।
রুপালি বলেন, ‘দুবাই থেকে ফেরার পর আমার পাওনা ১৮ লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। তবে কয়েক দফায় দুই লাখ দিয়েছে। বাকি ১৬ লাখ টাকা ও পাসপোর্ট ফেরত দিচ্ছিল না হান্নান। ১১ মে হান্নান দেশে ফেরত এসে জানায়, দুবাইয়ে যাওয়ার টিকিট কাটা হয়েছে। দুবাই যেতে রাজি হলে পাওনা টাকা ও পাসপোর্ট ফেরত দেবে। পাওনা টাকা ও পাসপোর্ট উদ্ধারের জন্য ১৪ মে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর পর্যন্ত যেতে বাধ্য হই।’
রুপালি বলেন, ‘দুবাইয়ে থাকাকালে পরিবারের সঙ্গে খুব কম যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো। কথা বলার সুযোগ দিলেও পরিবারের সদস্যদের কী বলছি, তা গোপনে রেকর্ড করা হতো।’
কে এই হান্নান
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও রুপালির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আব্দুল হান্নান আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। তার সহযোগীরা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসচ্ছল ও অল্প বয়সী নারীদের টার্গেট করে প্রথমে দুবাইয়ে উচ্চ বেতনে ভালো পেশায় চাকরির প্রলোভন দেখায়। এরপর দুবাইয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তরুণীদের যৌন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। এই চক্রের কাছে অনেক বাংলাদেশি তরুণী দুবাইয়ে আটক আছে। আব্দুল হান্নান মানব পাচারের অভিযোগে এর আগে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। তখন র্যাব জানায়, হান্নান ও তার চক্রের মাধ্যমে ৭২৯ নারীকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। তাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। র্যাব জানিয়েছিল, দেশের বিভিন্ন এলাকায় টোপ দিয়ে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে হান্নানের চক্রে ৫০ জন এজেন্ট রয়েছে। কোনো তরুণীকে সেখানে পাঠাতে পারলে জনপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হতো। হান্নানের বিরুদ্ধে মানব পাচারের আরও মামলা বিচারাধীন।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (সিরিয়াস ক্রাইম) মোহাম্মদ বদরুল আলম মোল্লা সমকালকে বলেন, এক তরুণীকে পাচার করা হচ্ছে– এটি জানার পরপরই বিমানবন্দর থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। জড়িত মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, আরও অন্তত ১৪ নারীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দুবাইয়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছে। তাদের উদ্ধারে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে। এর পেছনে দেশি-বিদেশি কারা রয়েছে, তা বের করা হবে।
পাচারের চিত্র
বাংলাদেশ পুলিশ ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে নারী ও শিশু।
সিআইডির পরিসংখ্যান বলছে, মানব পাচারের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২৫ সালে সিআইডির মানব পাচার ইউনিটে তদন্তাধীন মামলা ১২২টি, ২০২৪ সালে ১০০টি, ২০২৩ সালে ৮৬টি ও ২০২২ সালে ১১৪টি। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে মানব পাচারের অভিযোগে সিআইডি গ্রেপ্তার করেছে ৩৪৪ জনকে।
পাচারের রুট
পুলিশ সূত্র বলছে, বাংলাদেশ থেকে জলপথে মানব পাচারের প্রধান রুট দুটি। একটি হলো বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া। আরেকটি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে বিমানপথে মানব পাচারের কয়েকটি রুট হলো– বাংলাদেশ থেকে নেপাল, দু্বাই, মিসর ও লিবিয়া হয়ে ইতালি; বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিল, মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্র; বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া; বাংলাদেশ থেকে দুবাই হয়ে সার্বিয়া বা মেসিডোনিয়া; বাংলাদেশ থেকে নেপাল হয়ে কানাডা; বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব হয়ে রাশিয়া; বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ড হয়ে কম্বোডিয়া।
২০২১ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে এক বাংলাদেশি তরুণীকে বিবস্ত্র করে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। ওই সময় বাংলাদেশি তরুণীদের বিদেশে পাচারের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। এ ঘটনার মূল হোতা ছিল ঢাকার মগবাজারের রিফাদুল ইসলাম ওরফে ‘টিকটক হৃদয় বাবু’। টিকটকের ফাঁদে ফেলে তরুণীদের ভারতে পাচার করত সে। এই মামলায় ২০২২ সালের মে মাসে বেঙ্গালুরুর একটি বিশেষ আদালত টিকটক হৃদয় বাবুসহ সাত বাংলাদেশি নাগরিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, ‘এক দশক ধরে কাজের কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি নারীদের বিভিন্ন ডান্স বার, যৌনপল্লিতে বিক্রি করা হচ্ছে। দুবাইয়ে এ সংখ্যা বেশি। তাদের অনেকের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়। পরিবারের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে বিভিন্ন সময় অনেককে উদ্ধার করেছি। কাজ করতে গিয়ে নারীদের যাতে নির্যাতনের শিকার হতে না হয়– এ ব্যাপারে সরকার শক্ত পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছি।’
সাত বছরে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের অনেকে নিপীড়নের বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া অন্তত ৮০০ নারীর লাশ দেশে এসেছে। এর বাইরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি নারী পাচারের শিকার হয়েছেন।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১০ লাখের বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন ফিরেছেন, তার সঠিক তথ্য নেই।
করোনা মহামারি চলাকালে ২০২০ সালে ফিরেছেন ৪৯ হাজার ২২ জন নারী। বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বন্দি বা ডিপোর্টি হিসেবে ২০১৯ সালে তিন হাজার ১৪৪, ২০২১ সালে ১ হাজার ৮১১, ২০২২ সালে ছয় হাজার ২৯, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৯১৬, ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৩৭৫ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৮৯১ জন দেশে ফিরেছেন। এর আগে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৩৬৫ ও ২০১৯ সালে এক হাজার নারীর ফেরত আসার তথ্য রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত– এই চার বছরে শুধু সৌদি আরব থেকে ১৫ হাজারের বেশি নারী দেশে ফিরে এসেছেন।