দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী।
সামগ্রিকভাবে এসব আন্দোলনের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। সেগুলো হলো- উপাচার্যের (ভিসি) পদত্যাগ দাবি, নতুন উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ, শিক্ষকদের পদোন্নতি ও প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে আন্দোলন করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা সংকট, যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণচেষ্টার মতো ঘটনার বিচার এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমেছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ স্বার্থ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত জটিলতা নিয়েও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মতাদর্শিক সংঘর্ষের কারণে ক্যাম্পাসগুলোতে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
স্থবির পটুয়াখালী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য কাজী রফিকুল ইসলামের অপসারণ দাবির আন্দোলন অব্যাহত আছে। এবার পরীক্ষা বর্জন করে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। রবিবার ৪০০ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও তারা পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে উপাচার্যবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নেন। ভিসির পদত্যাগ দাবিতে অনড় শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের চলমান ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি মঙ্গলবার পর্যন্ত নয় দিনে গড়িয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে।
একদফা দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে প্রতিদিনই পালিত হচ্ছে উপাচার্যবিরোধী কর্মসূচি, অবস্থান ধর্মঘট, বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন। ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন আন্দোলনকারীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনেও তারা সমাবেশ করেছেন। এ সময় উপাচার্য, রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল। জরুরি সেবা, নথিপত্র ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন শুরুর পর থেকেই উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য ক্যাম্পাসের বাইরে রয়েছেন। এ অবস্থায় আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি এবং উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যপন্থিদের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র আকার ধারণ করে এবং বর্তমানে তা প্রকাশ্য বিভাজন ও সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ১১ মে উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। এ সময় বহিরাগতদের হামলায় একাধিক ব্যক্তি আহত হন। পরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম ‘শাটডাউন’ ঘোষণা করা হয়।
হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় দুমকি উপজেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক বশির উদ্দিন, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আহসান ফারুক ও সুলতান শওকত, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুসা ফরাজী এবং জেলা মহিলা দলের সদস্য হেলেনা খানমকে দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে সাবেক যুবদল নেতা সালাউদ্দিন রিপন শরীফসহ জড়িত সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বহিষ্কার আদেশে বলা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই এবং মতবিরোধ হলেই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের শোকজ ও চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, টেন্ডার, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। সম্প্রতি আন্দোলনরত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাদী হয়ে ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ইতোমধ্যে দুজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। হামলার পেছনে উপাচার্যপন্থি একটি গ্রুপ জড়িত ছিল। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ডেপুটি রেজিস্ট্রার রাহাত মাহমুদ বলেন, ‘শিক্ষকদের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ওপর বহিরাগতদের হামলা নজিরবিহীন ঘটনা। এ হামলার ঘটনায় উপাচার্যের নাম ইন্ধনদাতা হিসেবে উঠে আসায় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তার স্বার্থে তার অপসারণ এখন সময়ের দাবি। উপাচার্যকে অপসারণ, হামলায় ইন্ধনদাতা হিসেবে তার বিচার এবং হামলায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের গ্রেফতার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত পবিপ্রবির সব কার্যক্রম স্থগিত ও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’
রেজিস্ট্রার অধ্যাপক হাবিবুর রহমান জানান, যেহেতু উপাচার্যকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাই উপাচার্যের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন বন্ধ হওয়ার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে জানতে উপাচার্য কাজী রফিকুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।
ডুয়েটে সপ্তম দিনের মতো শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগের জেরে টানা সপ্তম দিনের মতো তিন দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে ডুয়েটের প্রশাসনিক ও দাফতরিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে মূল ফটকের কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। তবে ছয় দিনেও ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেননি ডুয়েট উপাচার্য।
সরেজমিনে ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকলেও খোলা রয়েছে পকেট গেট। সকাল থেকে কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। মূল ফটকের সামনে জ্বালিয়ে দেওয়া মোটরসাইকেলের অংশবিশেষ পড়ে আছে। ফটকের সামনে আসবাব ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে আন্দোলন শুরু হয়। এর পরপরই শিক্ষার্থীরা ডুয়েট ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তারা জয়দেবপুর শিমুলতলী রাস্তা অবরোধ করেন। পরদিন শুক্রবারও তাদের আন্দোলন চলমান থাকে। শনিবার তারা ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ‘লাল কার্ড কর্মসূচি’র ব্যানারে মূল ফটকে তালা লাগিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় শিবির-সমর্থিত ও ছাত্রদল-সমর্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বহিরাগতরা এই আন্দোলনে প্রবেশ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী এক হওয়ার পর রবিবার দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। এতে পুলিশ, শিক্ষার্থীসহ অন্তত ২৩ জন আহত হন। ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বহিরাগতদের সংঘর্ষের ঘটনায় মঙ্গলবার অজ্ঞাত ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করে পুলিশ। তবে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
শিক্ষার্থীদের দাবি, ডুয়েটের ভাইস চ্যান্সেলর ডুয়েটের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দিতে হবে। ডুয়েটের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের বাস্তবতা, একাডেমিক কাঠামো ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা ও ধারণা তুলনামূলক বেশি। ফলে ডুয়েটের উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ শিক্ষক থেকে উপাচার্য নিয়োগ অধিক কার্যকর হবে।
ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে ডুয়েটের প্রশাসনিক ও দাফতরিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে
নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, ‘আমি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি সব ঠিক হয়ে যাবে। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের বেতন, বোনাস, ওভারটাইমসহ যা বকেয়া ছিল তা পরিশোধের ব্যবস্থা করেছি। শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিচ্ছি এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে বলেছি।’
ক্যাম্পাসে কবে প্রবেশ করবেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমরা একটি সাধারণ সভা করবো। সবার সঙ্গে আলোচনা করে ধীরেসুস্থে ক্যাম্পাসে যাবো।’
তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন স্থগিত করলেন জাবি শিক্ষার্থীরা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বহিরাগত কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পর নারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে অশালীন অঙ্গভঙ্গি, হেনস্তাসহ পৃথক তিনটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। গত ১৩ মে ভোররাতে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টায় অভিযুক্তকে আটকের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন শিক্ষার্থীরা। সেই সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় মিছিল, উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান, প্রক্টরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা এবং প্রক্টর কার্যালয়ে তালা দেওয়ার মতো কর্মসূচি পালন করেন তারা। শেষমেশ রবিবার রাতে তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে চলমান আন্দোলন স্থগিত করেন শিক্ষার্থীরা।
গত রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা লাগিয়ে অবরোধ করেন। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এ অবরোধ অব্যাহত ছিল। অবরোধ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যবৃন্দসহ প্রশাসনিক অনেক কর্তা-ব্যক্তিরা তাদের কার্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেননি। এ সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বেঁধে দেওয়া ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রশাসন দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে তারা আবারও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাজিয়া বিনতে শামসুদ্দিন বলেন, ‘রবিবার প্রশাসনিক ভবনের সামনে আমাদের কর্মসূচি শেষ করার পর আমরা খবর পাই যে, ক্যাম্পাসের ইসলামনগর এলাকায় এক ছাত্রী হেনস্তার শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে আমরা যখন প্রক্টর অফিসে যাই, তখন সেখানে আরও দুজন হেনস্তাকারীকে দেখতে পাই। তখনই আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ি এবং বিক্ষোভে নামি। একই সময়ে ক্যাম্পাসের একটি দোকানের কর্মচারী বিক্ষোভকারী ছাত্রীদের আপত্তিকরভাবে ভিডিও করার একটি ঘটনাও ঘটে। ক্যাম্পাসে যেহেতু একের পর এক হেনস্তার ঘটনা ঘটেই চলেছে, তাই আমরা আমাদের দাবি নিয়ে আবারও রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিলাম। শেষে তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে চলমান আন্দোলন স্থগিত করেছি আমরা।’
তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন স্থগিত করলেন জাবি শিক্ষার্থীরা
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ-ভাঙচুর
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ভেতরে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরসহ কয়েকজন আহত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন। রবিবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা চললেও পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। রাত আড়াইটার দিকে উভয় পক্ষের আলোচনা শেষে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই দিন বিকাল ৪টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে ঝিনাইদহগামী বাসে কয়েকজন শিক্ষার্থী রওনা হন। বাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয় ও তার কয়েকজন বন্ধু উচ্চ স্বরে গান ও কথাবার্তা বলছিলেন। এতে বিরক্ত হয়ে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অন্তর বিশ্বাসের পাশের সিটে থাকা এক শিক্ষার্থী শান্ত হতে বলেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।
একপর্যায়ে পরিচয় ও সেশন জানতে চাওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ে। পরে হৃদয় ও অন্তর বিশ্বাসের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে অন্তর বিশ্বাসকে মারধরের দৃশ্য দেখা যায়। তবে হৃদয়ের দাবি, প্রথমে অন্তরই তাকে আঘাত করেন। পরে উভয় পক্ষের শিক্ষার্থীরা বাস থেকে নেমে যান। রাত সাড়ে ৮টার দিকে তারা আবার ঝিনাইদহ থেকে ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীরা জড়ো হলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়না চত্বর ও প্রধান ফটকের দুই পাশে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখা ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। পরে লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীরা মীর মশাররফ হোসেন ভবন এলাকায় এবং বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ফলিত রসায়ন ও প্রযুক্তি অনুষদ ভবনে অবস্থান নেন। এ সময় আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রযুক্তি অনুষদ ভবনের জানালার কাচ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ভেতরে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শাহীনুজ্জামান বলেন, উভয় পক্ষের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হয়। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আর কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না বলে সবাই সম্মত হয়েছেন। বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
উপাচার্য বদল হতেই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন স্থগিত
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শিক্ষকদের চলমান কমপ্লিট শাটডাউন ও তীব্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছে। গত ১৪ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন রশিদকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ম উপাচার্য হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ওই দিনই শাটডাউন থেকে সরে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
আন্দোলনের প্রধান কারণ প্রায় ৬০ জন শিক্ষকের দীর্ঘদিনের বকেয়া পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন বোর্ড না বসানোর কারণে শিক্ষকরা ক্ষুব্ধ হন। দাবি আদায়ে শিক্ষকরা প্রথমে সর্বাত্মক অসহযোগ এবং পরে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে কমপ্লিট একাডেমিক ও প্রশাসনিক শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
আন্দোলন চলাকালীন শিক্ষকরা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনের কক্ষগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং ৭১ জনেরও বেশি শিক্ষক তাদের অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। একইসঙ্গে তৎকালীন উপাচার্য ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালার অজুহাতে পদোন্নতি আটকে রাখছেন অভিযোগ তুলে শিক্ষকরা তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
সর্বশেষ ১৪ মে সকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম পুলিশ পাহারায় প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে দফতরে প্রবেশ করলে ক্যাম্পাসজুড়ে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই দিনই (১৪ মে) সরকার উপাচার্য তৌফিক আলমকে সরিয়ে নতুন ভিসি অধ্যাপক মামুন রশিদকে দায়িত্ব দেয়। নতুন উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ার পর আন্দোলনকারী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, তাদের মূল দাবি (তৎকালীন ভিসির অপসারণ) পূরণ হওয়ায় তারা চলমান আন্দোলন আপাতত স্থগিত করছেন এবং নতুন ভিসির সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। এই দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে ক্লাস-পরীক্ষা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তীব্র সেশনজটের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মো.আবুবকর সিদ্দিক বলেন, ‘প্রমোশনসহ অন্যান্য জটিলতার দাবিতে শিক্ষকরা আন্দোলন করেছেন। ভিসি পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে শিক্ষকদের আন্দোলন স্থগিত হয়েছে, যেটা স্বস্তির বিষয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ড. আবদুল আলিম বছির বলেন, ‘নবনিযুক্ত উপাচার্যের সঙ্গে আমাদের আলোচনা সভা হয়েছে। আলোচনায় তিনি শিক্ষকদের পদোন্নতির সমাধানের কথা বলেছেন।’