দেশের ব্যাংক খাতে চলমান নানা সংকটের মধ্যেও আমানতের নিরাপত্তা ও গ্রাহক আস্থায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকের আস্থা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে, ফলে আমানতের দিক থেকে এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। প্রায় তিন কোটি গ্রাহকের আমানত নিয়ে এই অবস্থান ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বৃহস্পতিবার ইসলামী ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ব্যাংকটির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য কোনো চেক বাউন্সের ঘটনা নেই, যা গ্রাহক আস্থাকে আরও দৃঢ় করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক আমানতের পাশাপাশি রেমিট্যান্স আহরণ ও বিনিয়োগ সক্ষমতায় অনন্য অবস্থানে রয়েছে। দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় ব্যাংকটির আকার, শাখা বিস্তৃতি এবং অর্থনৈতিক অবদান বর্তমানে বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের পুরো ব্যাংক খাতের মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামি ব্যাংক খাতের মোট আমানত প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় ৩৯ শতাংশ এককভাবে ধারণ করছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অন্য শীর্ষ ব্যাংকগুলো যেখানে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাজার অংশীদারত্ব অর্জন করতেই হিমশিম খায়, সেখানে ইসলামী ব্যাংকের এই অবস্থান দেশের আর্থিক খাতে শক্তিশালী আস্থার প্রতিফলন।
প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে প্রায় তিন কোটি গ্রাহক ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করছেন। দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যাংকটি আর্থিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। ব্যাংকটির রয়েছে ৪০০টি শাখা, ২৭৬টি উপশাখা এবং প্রায় ২ হাজার ৮০০ এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট। এই বিস্তৃত ভৌগোলিক নেটওয়ার্ক দেশের অন্য যেকোনো ব্যাংকের তুলনায় অনেক বড় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সূত্র জানায়, বিশেষ করে রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশের প্রায় দুই কোটি প্রবাসীর মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ প্রবাসী এই ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠান। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৪ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ১৯ শতাংশ বা প্রায় ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এককভাবে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে। দ্রুত সেবা, বিশ্বস্ততা এবং শক্তিশালী বৈদেশিক নেটওয়ার্কের কারণে প্রবাসীদের কাছে ইসলামী ব্যাংক এখন আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময়েও ইসলামী ব্যাংক তার শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে থাকতে সক্ষম হয়েছে। পুরো ব্যাংক খাত যখন ডলার সংকটে চাপে ছিল, তখনো ইসলামী ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের ‘ধাক্কা সামালদাতা’ বা স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করেছে।
জানা গেছে, শিল্প খাতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ইসলামী ব্যাংকের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, আত্মকর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যাংকটির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হুসাইন বলেন, আমাদের গ্রাহকরা কথায় নয় কাজে বিশ্বাস করেন। ইসলামী ব্যাংকের আমানত নিরাপদ। কেউ চেক দিয়ে টাকা পায়নি তার কোনো নজির নেই। আমাদের বিশাল কর্মি বাহিনী গ্রাহকের জন্য নিবেদিত। গ্রাহকের চাওয়াটা পূরণ করাটা নিজেদের মনে করেন। সেজন্য তিন কোটি গ্রাহক রয়েছে। তারা কথায় নয় কাজে বিশ্বাস করেন। মূলত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকের সঙ্গে অন্যদের তুলনা হয় না। আর আমাদের বোর্ডে গ্রাহকদের প্রাধান্য দিয়ে সব করা হয়। বর্তমান বোর্ড সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সময়মতো নীতি ও অন্যান্য পরামর্শ দিচ্ছে। ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক জনতার ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। সেটা আস্থা, সেবা এবং কল্যাণকামী কার্যক্রমের কারণে সম্ভব হয়েছে। আশা করা যায়, আগামীতেও ব্যাংকটি সেরা অবস্থান অটল রাখতে পারবে।
জানা গেছে, প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট ব্যাংকিংয়েও বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘সেলফিন’ শুধু একটি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন শাখাবিহীন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকের বিনিয়োগ চাহিদা বিশ্লেষণ ও দ্রুত সেবা প্রদান আরও সহজ হবে।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায়ও ইসলামী ব্যাংক বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্প, উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং বহুমুখী বিনিয়োগ খাতে শরিয়াহ্ভিত্তিক বন্ড বা ‘সুকুক’-এর মাধ্যমে বড় বিনিয়োগ আসতে পারে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগের অন্তত ১৫ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকিং চ্যানেলের সুকুক থেকে আসবে।